চন্দ্রবোড়া
Daboia russelii · Russell's Viper
📋 এক নজরে পরিচিতি
বেসিক ওয়েব ডাটা🔍 চন্দ্রবোড়া চেনার নিশ্চিত উপায় ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য
Russell's viper (Daboia russelii) বা চন্দ্রবোড়া সাপ আমাদের উপমহাদেশে সর্বপ্রথম শনাক্ত করা হয় ১৭৯৭ সালে। George Shaw এবং Frederick Polydore Nodder ১৭৯৭ সালে চন্দ্রবোড়া সাপ নথিভুক্ত করেন। এর আগে ১৭৯৬ সালে সনামধন্য হার্পেটোলজিস্ট Patrick Russell এর লেখা 'An account of Indian serpents, collected on the coast of Coromandel' বইতে চন্দ্রবোড়া সাপের পরিচয় নথিভূক্ত করেছিলেন এবং তার নামের সম্মানেই চন্দ্রবোড়া সাপের নামকরণ Russell’s viper করা হয়। তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশ অখণ্ডিত থাকায় বাংলাদেশ, ভারত কিংবা পাকিস্তানের আলাদা রেকর্ড হবার কোনো প্রশ্নই ছিলোনা, কেননা ঔপনিবেশিক শাসন আমলে ভারতীয় উপমহাদেশকে একটি অঞ্চল বলেই বিবেচনা করা হতো। আলাদা ভাবে স্বাধীন বাংলাদেশে চন্দ্রবোড়া সাপ সর্বপ্রথম ১৯৮২ সালে ' Wildlife of Bangladesh: A Checklist' বইয়ে নথিভূক্ত করেন প্রখ্যাত প্রাণিবিদ আলি রেজা খান স্যার। এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৯২ সালে আলি রেজা খান স্যারের লেখা ' বাংলাদেশের সাপ' বইয়ে চন্দ্রবোড়া সাপের উল্লেখ পাওয়া যায়। এথেকে পরিস্কার যে চন্দ্রবোড়া সাপের আদি বাসস্থান বাংলাদেশ, একথা অস্বীকার করে চন্দ্রবোড়া সাপ ভারত থেকে ভেসে এসেছে এমন মনে করার কোনো সুযোগ নেই।
📖 বিস্তারিত পরিচিতি ও স্বভাব
এদেশে চন্দ্রবোড়া সাপের বাসস্থান কোথায়? ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত গবেষণা অনুযায়ী দেশের অন্তত ১৭ টি জেলায় চন্দ্রবোড়া সাপের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম হলো সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চল, গড়াই এবং পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চল [ জেলার তালিকা ছবিতে সংযুক্ত ]। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে মুন্সিগঞ্জ সহ দেশের কতিপয় যায়গায় চন্দ্রবোড়া সাপের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। • সাম্প্রতিক সময়ে চন্দ্রবোড়া সাপের বিস্তার এবং সাপ-মানুষ সংঘাতের কতিপয় সম্ভাব্য কারনঃ নাব্যতা সংকটে নতুন চড় সৃষ্টি যা চন্দ্রবোড়া সাপের আদর্শ বাসস্থান। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সরীসৃপের উপর তাপমাত্রার ব্যপক প্রভাব। তাপমাত্রার পরিবর্তনে সরীসৃপের বাসস্থান কিংবা আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্যনীয়। চড় অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ, এতে চন্দ্রবোড়ার পছন্দসই শিকার ইঁদুরের প্রভাবে সাপ-মানুষের দুরত্ব কমে যাওয়া। নতুন বাসস্থানের সম্প্রসারণ হলেও পুরোনো বাসস্থান নষ্ট করে ফেলা, এতে সাপ সহসাই জনমানবের কাছাকাছি আসতে বাধ্য হচ্ছে। প্রয়োজনীয় খাদ্যের চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন, এতে শষ্যের প্রাচুর্যে ইঁদুরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে এবং সাপ শিকারে লোভে ইঁদুরের কাছাকাছি বেশি অবস্থান করছে।
🌿 বাসস্থান, বিস্তৃতি ও খাদ্যাভ্যাস
শুষ্ক ও উন্মুক্ত চড় অঞ্চল, বরেন্দ্র এলাকা, নদীর তীরবর্তী ঝোপঝাড় এবং ঘাসযুক্ত মাঠ এদের প্রিয় বাসস্থান।
পদ্মা ও গড়াই নদীর অববাহিকাসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের ১৭টিরও বেশি জেলায় এদের উপস্থিতি রয়েছে।
এরা নিশাচর এবং অলস প্রকৃতির হলেও খুব দ্রুত ও মারাত্মকভাবে দংশন করতে পারে। মুখোমুখি হলে প্রেশার কুকারের মতো তীব্র জোরে 'হিস হিস' শব্দ করে সতর্ক করে।
🛡️ বাস্তুতন্ত্রে ভূমিকা ও সুরক্ষা বার্তা
সংঘাতে করনীয়ঃ চন্দ্রবোড়া সাপের মুখোমুখি হয়ে গেলে আপনি দেখার আগেই সাপ আপনাকে সতর্ক করবে। প্রেশারকুকারের মতো খুব জোড়ে 'হিস হিস' শব্দ করে নিজের অবস্থান জানান দেয়। এমতাবস্থায় নিরাপদ দুরত্ব বজার রেখে সেই স্থান পরিত্যাগ করলে সংঘাতের কোনো সম্ভাবনা নেই। সাপ মারতে গেলে বা একেবারে সাপের গায়ের কাছে চলে গেলে সাপ প্রতিরক্ষার জন্য কামড় দিতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত চন্দ্রবোড়া সাপের দংশন হলে এক মুহুর্ত দেরী না করে এন্টিভেনম সমৃদ্ধ হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। যথা সময়ে চিকিৎসা নিশ্চিত না করতে পারলে অঙ্গহানি এমনকি মৃত্যু হতে পারে। তাই সাপের কামড়ে ওঝার কাছে নয় বরং সঠিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে হয়। মানুষ ভালো থাকুক, প্রকৃতির সন্তানেরাও ভালো থাকুক। লেখা: সাহাদাত হোসেন। ছবি: Md Tanvir Tasnim Ovi, Christopher Shannon ও সংগৃহীত।
🚨 সাপে কামড়ালে জরুরি করণীয় ও বর্জনীয়
সাপের কামড়ে প্রথম কয়েক মিনিটের সঠিক সিদ্ধান্ত জীবন বাঁচায়। ওঝা-কবিরাজের কুসংস্কার পরিহার করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
জরুরি করণীয় (অবিলম্বে যা করবেন)
WHO নির্দেশিত বৈজ্ঞানিক প্রাথমিক চিকিৎসা- 🧘রোগীকে শান্ত রাখুন: আতঙ্কিত হলে হৃৎস্পন্দন বাড়ে এবং রক্তে বিষ দ্রুত ছড়ায়। রোগীকে আশ্বস্ত করুন যে অধিকাংশ সাপ নির্বিষ এবং সরকারি অ্যান্টিভেনম সম্পূর্ণ কার্যকর।
- 🪵আক্রান্ত অঙ্গ নিশ্চল রাখুন: হাত বা পায়ের জয়েন্ট একদম বাঁকা করবেন না। কাঠের স্কেল বা বাঁশের চটা ও সুতি কাপড় দিয়ে স্প্লিন্ট তৈরি করে অঙ্গটিকে স্থির করে দিন।
- 💍আংটি ও টাইট পোশাক খুলে ফেলুন: আংটি, চুড়ি, ঘড়ি বা টাইট পোশাক অবিলম্বে খুলে ফেলুন, কারণ সাপের বিষের প্রভাবে অঙ্গটি দ্রুত ফুলে যেতে পারে।
- 🏥দ্রুত সরকারি হাসপাতালে নিন: রোগীকে একা না হাঁটিয়ে অ্যাম্বুলেন্স বা যানবাহনে শুইয়ে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
মারাত্মক বর্জনীয় (ভুলেও যা করবেন না)
প্রচলিত ভুল যা রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়- 🚫শক্ত গিট বা টাইট টর্নিকেট বাঁধবেন না: দড়ি বা তার দিয়ে শক্ত করে বাঁধলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে অঙ্গ পচে গিয়ে কেটে ফেলতে হতে পারে (গ্যাংগ্রিন)।
- 🔪ব্লেড দিয়ে কাটবেন না বা বিষ চুষবেন না: কামড়ের স্থানে ব্লেড বা ছুরি দিয়ে রক্তক্ষরণ করাবেন না। মুখ দিয়ে বিষ চোষা প্রাণঘাতী ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
- 🧙ওঝা বা কবিরাজের কাছে যাবেন না: ওঝার কোনো ক্ষমতা নেই সাপের বিষ নষ্ট করার। সময় নষ্ট করাই রোগীর মৃত্যুর মূল কারণ। সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
- 🧪কোনো ভেষজ রস বা অ্যাসিড দেবেন না: কোনো প্রকার চুনের পানি, গাছের শিকড় বা রাসায়নিক প্রয়োগ করবেন না। শুধুমাত্র পরিষ্কার পানি দিয়ে হালকা ধুয়ে নিন।
আরও অন্যান্য সাপের প্রজাতি দেখুন
লোকালয়ে বা বাড়িতে সাপ দেখলে কী করবেন?
সাপ মারবেন না। আমাদের ৬৪ জেলার ভেরিফায়েড উদ্ধারকারীরা সাপ অক্ষত উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করতে সদা প্রস্তুত।