সাপের বিষ থেকে নাকি অনেক জীবন প্রদায়ী ঔষধ তৈরি হয়? এটা কি সত্য নাকি শুধুই গুজব!
না, এটি কোনো গুজব বা ভুল সংবাদ নয়। চিকিৎসা ক্ষেত্রে সাপের বিষের রয়েছে নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার! প্রাণঘাতী বিষধর সাপের কামড়ের একমাত্র চিকিৎসা হিস...
না, এটি কোনো গুজব বা ভুল সংবাদ নয়। চিকিৎসা ক্ষেত্রে সাপের বিষের রয়েছে নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার! প্রাণঘাতী বিষধর সাপের কামড়ের একমাত্র চিকিৎসা হিসেবে আমরা যে অ্যান্টিভেনোমের মাধ্যমে চিকিৎসা নিয়ে থাকি সেটা আসে সাপের বিষ থেকেই। সাপের বিষ ঘোড়ার রক্তে ইনজেক্ট করলে ঘোড়ার রক্তে শক্তিশালী অ্যান্টিবডি উৎপন্ন হয়, এই অ্যান্টিবডি ঘোড়ার রক্ত থেকে ফিল্টার করে জটিল প্রক্রিয়ার পরে বোতলজাত করা হয়, এটাই অ্যান্টিভেনোম। এছাড়াও মেডিক্যাল সাইন্সে সাপের বিষ অতি আগ্রহের জৈব রাসায়নিক। জীবণ প্রদায়ী উচ্চ মাত্রার ঔষধ গুলোর মূল উপাদানের অনুরূপ উপাদান শনাক্তের চেষ্টা চলছে সাপের বিষ গবেষণা করে। সাপের বিষ জৈব রাসায়নিক হওয়ায় এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে, তাই এটা ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্টিস্ট দের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জানলে অবাক হবেন, সাপের বিষকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে তরল হীরা নামে অভিবাদন করা হয়। সাপের বিষ অনেক রোগের প্রতিষেধক তৈরিতে গবেষণাগারে বিক্রিয়ার প্রভাবক বা অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। সর্বোচ্চ মানের এক কেজি গোখরা সাপের বিষের দাম ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। সাপের বিষ বাতাসের সংস্পর্শে নষ্ট হয়ে যায়, তাই বিষ সংগ্রহের ১ ঘন্টার মধ্যে -২০° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় রেখে এর জলীয় অংশ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে সাপের বিষ ড্রাই পাউডারে পরিণত হয়। এই পাউডার দিয়েই মূলত গবেষণামূলক কাজ করা হয়। উন্নত দেশগুলিতে নেশাদ্রব্য হিসেবেও এটির বহুল ব্যবহার রয়েছে। সাপের বিষ হল উচ্চমাত্রার প্রোটিন, এনজাইম এবং অন্যান্য অণুর একটি জটিল মিশ্রণ যা ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে সাপের বিষ সংগ্রহ করে সেন্ট্রিফিউগেশন, ক্রোমাটোগ্রাফি এবং ইলেক্ট্রোফোরসিসের মতো কৌশল ব্যবহার করে বিষকে বিভিন্ন উপাদানে আলাদা করা হয়। তারপরে বিষের পৃথক উপাদানগুলিকে আল্ট্রাফিল্ট্রেশন এবং আয়ন-বিনিময় ক্রোমাটোগ্রাফির মতো কৌশল ব্যবহার করে উচ্চ মাত্রায় বিশুদ্ধ করা হয়। পরিশেষে বিশুদ্ধ যৌগগুলিকে ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় যা ক্রিম, মলম, ইনজেকশন বা বড়ির আকার রোগীকে প্রয়োগ করা হয়। সাপের বিষকে মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে তৈরী হয়েছে এমন কয়েকটি ঔষধের বর্ণনা করা হলো: ১. হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ হল থ্রম্বোসিস বা রক্তের জমাটবাঁধা৷ যে সব ওষুধ দিয়ে রক্তের জমাটবাঁধা দূর করা বা প্রতিহত করা যায়, সেগুলিতে রয়েছে অনেক ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া৷ সাপের বিষে শুধু যে রক্ত জমাটবাঁধা প্রতিহত করার উপাদান রয়েছে তাই নয়, কিছু কিছু উপাদান আবার জমাট বাঁধতেও সাহায্য করে৷ অর্থাৎ এক ধরনের উপাদানের কারণে শিরায় রক্ত যেমন জমাট বেঁধে যায়, অন্য উপাদানের কারণে আবার দেহের কোষে রক্ত প্রবাহিত হয়৷ ফলে রক্তের ঘনত্ব কমে যায়, যা মারাত্মক হতে পারে৷ সাপের বিষে একধরনের উপাদান থাকে, যা রক্তের কোলাজেন তৈরিতে বাধা দেয়৷ সেই উপাদান গুলো সংগ্রহ করে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ তৈরী করা হয় যেগুলো হার্টের নালিতে রক্ত জমাট বেঁধে ব্লকেজ জনিত সমস্যায় খুব দ্রুত এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত সমাধান করতে সক্ষম। ২. Brazilian Pit Viper (Bothrops Jararaca) সাপের বিষ থেকে 'ক্যাপ্টোপ্রিল (captopril)' নামক জীবণ প্রদায়ী ঔষধ তৈরী হয়। উচ্চ রক্তচাপ কমানো, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এবং কিডনির সমস্যা প্রতিরোধ করতে একা বা অন্যান্য ওষুধের সাথে এটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। উচ্চ রক্তচাপ হৃৎযন্ত্র ও ধমনীর কাজের চাপ বাড়িয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় চলতে থাকলে হৃৎযন্ত্র এবং ধমনীগুলি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এটি হার্ট ফেইলিউরের চিকিৎসা, ডায়াবেটিসজনিত কারণে কিডনিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে এবং হার্ট অ্যাটাকের পরে হার্ট ফেইলিউর প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। ক্যাপ্টোপ্রিল হল একটি ACE ইনহিবিটার এবং এটি রক্তনালীগুলিকে আরো বেশি পাতলা ও নমনীয় করে যাতে রক্ত সহজে প্রবাহিত হয়, ফলে ব্লাড প্রেসারের ঝুঁকি কমে। মাত্র ২ সপ্তাহের ক্যাপ্টোপ্রিল ব্যবহারে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয় বলে দাবি করছেন এই ঔষধ আবিষ্কারকগণ। এটি Capoten® নামের ব্র্যান্ডিংএ বিভিন্ন দেশে বিক্রি হয়। ৩. Saw-scaled viper এর বিষ থেকে এমন একটি ঔষধ আবিষ্কার হয় যা নির্দিষ্ট ধরণের বুকে ব্যথা এবং হার্ট অ্যাটাকের পরে হৃৎপিণ্ডের ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দিতে বিশেষভাবে কার্যকরী। ঔষধটির প্রাথমিক নাম টিরোফিবান (Tirofiban) ইনজেকশন। Tirofiban হল একটি নন-পেপটাইড অণু। 1988 সালে স-স্কেলড ভাইপারের বিষ থেকে এটি প্রথম আলাদা করা হয়েছিল এবং ফাইব্রিনোজেন ঘটিত প্লাটিলেট'স একত্রিত হয়ে রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা প্রদান করতে বিশেষভাবে কার্যকর ছিলো। পরবর্তীতে এটি মেডিক্যাল সাইন্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কৃত ঔষধের স্বীকৃতি অর্জন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে Aggrastat® নামে বিক্রি হয় এটি। ৪. American Southeastern pygmy rattlesnake এর বিষ থেকে 'এপ্টিফাইব্যাটাইড' (Eptifibatide) নামক বিশেষ ঔষুধ তৈরী করা হয় যা 'মায়োকার্ডিয়াল ইস্কেমিয়া' তথা আকষ্মিক হৃৎপিণ্ডের রক্তপ্রবাহ হ্রাসজনীত কারণে হার্টঅ্যাটাক এবং 'মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন' তথা কোএটি কিছুটা Saw-scaled viper এর বিষ থেকে তৈরী টিরোফিবান (Tirofiban) ইনজেকশনের পদ্ধতিতেই কাজ করে থাকে। বিভিন্ন দেশে Integrilin® নামে বিক্রি হয় এটি। ৫. আলৎসহাইমারের রোগ (Alzheimer's Disease) এক ধরনের বার্ধক্যজনিত ও সুস্পষ্ট কারণবিহীন স্নায়বিক অবক্ষয়মূলক রোগ। এই রোগের কোনও প্রতিকার ছিলোনা এতদিন পর্যন্ত, কিন্তু খুবই সাম্প্রতিক সময়ে কালাচ (krait) প্রজাতির সাপ গুলোর বিষ দিয়ে এর চিকিৎসা করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কালাচের পাশাপাশি রাসেল'স ভাইপারের বিষ থেকেও কিছু ক্ষেত্রে এই রোগের চিকিৎসা করা যায় কিনা সেটা নিয়ে ব্যপক গবেষণা চলছে, মোটামুটি পজিটিভ রিপোর্টই আসছে। ১৯০৬ সালে জার্মান মনোচিকিৎসক ও স্নায়ুরোগবিজ্ঞানী আলইস আলৎসহাইমার সর্বপ্রথম এ রোগটির বর্ণনা দেন। তাই তার নামানুসারেই এ রোগের নাম রাখা হয়। সাধারণত মধ্য বয়সের শেষের দিকে বা বার্ধক্যে এসে (মোটামুটি ৬৫ বছর বয়সের বেশি বয়সের) লোকেরা এই রোগে আক্রান্ত হন। তবে আলৎসহাইমারের রোগের প্রারম্ভিক সূত্রপাত অনেক আগেও হতে পারে। এই রোগের ফলে উত্তরোত্তর স্মৃতিহানি ঘটে, চিন্তার করার ক্ষমতা হ্রাস পায়, স্থান-কাল-পাত্রে বিভ্রম ঘটে, ব্যক্তিত্ব ও মেজাজে পরিবর্তন আসে। এটি ডিমেনশিয়া বা চিত্তভ্রংশ নামক মানসিক রোগের প্রাথমিক পর্যায়। এই রোগে আক্রান্তের মস্তিষ্কে তিনটি উপাদানের অস্বাভাবিক উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছেঃ ★বিটা-অ্যামিলয়েড চাপড়া ★স্নায়ুতন্তুজট (নিউরোফাইব্রিলারি ট্যাঙ্গেল, যা টাউ প্রোটিন দ্বারা গঠিত এক ধরনের আঁশ) ★অ্যাসিটাইলকোলাইন ক্রেইট সাপের বিষে প্রি-সিন্যাপ্টিক এবং পোস্ট সিন্যাপ্টিক নিউরোটক্সিন থাকে। পোস্ট-সিন্যাপ্টিক নিউরোটক্সিন গোখরার বিষেও দেখা যায়, এটা কমন। প্রি-সিন্যাপ্রিক নিউরোটক্সিনকে বাংগারোটক্সিন (Bungarotoxin) বলা হয়। এই বিষ শরীরে গেলে নিউরনের সিন্যাপ্সের নিউরোমাস্কিউলার জাংশন পয়েন্টের শুরুর অংশ, যেখান থেকে ইলেক্ট্রিক সিগন্যাল কেমিল্যাল সিগন্যালে পরিণত হয় সেখানে হিট করে। যে কেমিক্যালগুলোর সাহায্যে সিগন্যালটা পোস্ট-সিন্যাপ্টিকের মাসকিউলার অংশে পৌঁছায় সেটাকে নিউরোট্রান্সমিটার বলে। আমাদের দেহের প্রায় সব কেমিক্যাল সিগন্যালই AChE বা অ্যাসিটাইলকোলাইন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। ক্রেইটের বিষ এই নিউরোট্রান্সমিটারের উৎপত্তি ও সংরক্ষণ কেন্দ্র যেটাকে ভ্যাসেল'স বলে, সেটাকে ধ্বংশ করে দেয়। ফলে নিউরোট্রান্সমিটার উৎপত্তি বন্ধ হয়ে যায়, এবং আমাদের পেশিতে নিউরণ হতে তথ্য আসতে পারেনা। ক্রেইটের বিষ AChE ক্রিয়াকলাপকে বাধা দেওয়ার কারণে আল্জ্হেইমের রোগ নিরাময়ের জন্য একটি থেরাপিউটিক এজেন্ট হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা রোগীর মধ্যে নিউরোট্রান্সমিটার (এসিটাইলকোলাইন) এর পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
৬. মরফিন একটি জৈব যৌগ। এর রাসায়নিক সংকেত C17H19NO3 এবং এটি আফিং-এর প্রধান উপাদান। এটি একটি উপক্ষার ( Alkaloid ) এবং প্রবলভাবে কার্যকরী ব্যথানাশক। এটি সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উপর কাজ করে ব্যথার অনুভূতি নাশ করে। এটি অতি নিদ্রাকারক হিসেবেও বহুল ব্যবহৃত। মরফিন প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত অ্যালকালয়েড জাতীয় পদার্থ যা অপিয়াম পপি নামক উদ্ভিদের অপরিপক্ক বীজের আঠালো রস থেকে আহরণ করা হয়। এর কিছু সাধারণ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে বমি, স্থায়ী বমিভাব এবং শুকনো মুখ অন্তর্ভুক্ত। কিছু প্রতিকূল পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে অনিয়মিত মাসিক, যৌনক্ষমতা হ্রাস, মাথা ঘোরা, বিষণ্নতা এবং ওপিয়ডের উপর নির্ভর করা অন্তর্ভুক্ত। তবে স্বস্তির খবর হলো Black mamba (Dendroaspis polylepis) সাপের বিষ থেকে মরফিনের বিকল্প তৈরি করা সম্ভব। যা পেইনকিলার হিসেবে কাজ করে। এর পাশাপাশি মরফিনের আরো কিছু চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা যাবে। অস্ত্রোপচারকালে রুগীকে অজ্ঞান করতে, হৃদপিণ্ডের অসুখ যেমন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোম এবং ফুসফুসের ইডিমা বা শোথরোগেও মরফিনের পরিবর্তে ব্লাকমাম্বার বিষ ব্যবহার করা সম্ভব। ৭. Golden Lancehead Viper (Bothrops Insularis) এবং গোখরো তথা naja গণের সাপের বিষ থেকে একপ্রকার সুপার-গ্লু তৈরি হয়েছে, যেটা অপারেশনের পর দ্রুত রক্ত বন্ধ হতে সাহায্য করে। এই সাপেদের বিষে একপ্রকার বিশেষ অ্যানজাইম থাকে, ব্যাট্রোক্সোবিন Batroxobin (এটি রেপটিলেজ নামেও পরিচিত)। এটি রক্তে মিশে রক্তে ঘনত্ব বাড়িয়ে দেয়, রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। মেডিক্যাল সাইন্স দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্রোপচারের সময় রক্তপাতের চিকিত্সার জন্য এটি ব্যবহার করে আসছে এবং কিছু বছর আগে এই ব্যাট্রোক্সোবিন অ্যানজাইমকে ন্যানোফাইবার হাইড্রোজেলের সাথে মিশ্রিত করে একটি ইনজেকশনযোগ্য 'ব্যান্ডেজ' তৈরি করা হয়েছিল। যাকে fibrin glue বলা হচ্ছে চিকিৎসা ক্ষেত্রে। এটি Defibrase®, Plateltex-Act®, Vivostat® ইত্যাদি নামে বাজারজাত করা হয়। ৮. বিভালিরুডিন (Bivalirudin) একটি সরাসরি থ্রম্বিন ইনহিবিটর যা হেপারিন-প্ররোচিত থ্রম্বোসাইটোপেনিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। এটি মূলত হেমোটক্সিন ভেনোম তথা ভাইপার গোত্রীয় সাপের বিষের উপাদান থেকে উৎপন্ন হয়। এটি রক্তের জমাট ভেঙে স্বতঃস্ফূর্ত রক্ত চলাচলে সহায়তা করে। বিভিন্ন দেশে Angiomax® নামের ব্র্যান্ডিংএ ঔষধটি বিক্রি হয়ে থাকে। ৯. এনাপ্রিল (Enalapril) রক্তনালি শক্ত করতে সক্ষম এমন উপাদান গুলোকে ব্লক করে দেয়। ফলে এটি রক্তনালীগুলিকে নরম ও পাতলা করে। এনাপ্রিল রক্তচাপ কমাতে এবং হার্টে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়াতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিক, কিডনিজনিত রোগ এবং হার্ট ফেইলিওর চিকিত্সার জন্য ব্যবহৃত একটি ACE ইনহিবিটার ওষুধ। এটি সাধারণত ফুরোসেমাইডের সাথে ব্যবহার করা হয়। এটি মুখ দিয়ে বা শিরাতে ইনজেক্টের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। মুখ দিয়ে নেওয়া হলে প্রভাবগুলি সাধারণত এক ঘন্টার মধ্যেই শুরু হয় এবং এক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এনাপ্লিল বিভিন্ন দেশে Vasotec® নামের ব্র্যান্ডে বিক্রি হয়। এটি প্রয়োগের পর রোগীদের সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে মাথাব্যথা, ক্লান্তি, দাঁড়ানো অবস্থায় মাথায় অস্বস্তি বোধ হওয়া, বোমি এবং কাশি হওয়া। গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এনজিওডিমা এবং নিম্ন রক্তচাপ। গর্ভাবস্থায় ব্যবহারের ফলে শিশুর ক্ষতি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। ১০. কিছু বিষ-ভিত্তিক বায়োটক্সিনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হল এগুলো ব্যথার সংকেত নিউরন থেকে পেশিতে স্থানান্তরের সময় মাঝে নিউরোট্রান্সমিটার চলাচলে বাধা প্রদান করে৷ যার ফলে ব্যথার অনুভূতি কমতে শুরু করে। কমপক্ষে ৩ মাস যাবৎ কোনো ব্যথা স্তায়ী হলে তাকে ক্রোনিক্যাল পেইন বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বলে। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার চিকিৎসায় ব্যথানাশক হিসাবে বায়োটক্সিনের ব্যপক সম্ভাবনা রয়েছে। কোবরাটাইড (Cobratide) হলো এমন একটি ঔষধ যেটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। এটি chinese cobra (Naja atra) সাপের বিষ থেকে প্রস্তত করা হয়। বিশ্বব্যপি এটি Ketongning®, cobrotoxin® নামের ব্র্যান্ডিংএ বিক্রি হয়ে থাকে। ১১. অ্যানক্রোড (ancrod) হলো মালয়ান পিট ভাইপার (Calloselasma rhodostoma) সাপের বিষ থেকে তৈরী একটি অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট যা সঞ্চালনকারী প্লাজমা ফাইব্রিনোজেনকে নিষ্ক্রিয় করে কাজ করে। অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট এমন একটি ঔষধ যা রক্তকে পাতলা করতে সাহায্য করে। এর প্রয়োগের মাধ্যমে রক্তের জমাট ভাঙে এবং রক্তনালি পরিষ্কার হয়৷ প্রাকৃতিক ভাবে কিছু প্রাণী যেমন জোঁক, মশা ইত্যাদির লালায় অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট পদার্থ থাকে। যার ফলে এরা দেহ থেকে রক্ত নিলে রক্ত ধীরে জমাট বাঁধে। ২০১৭ সালের আগ পর্যন্ত Viprinex® নামের ব্র্যান্ডিংএ ঔষধটি বিশ্বব্যপি বিক্রি হলেও কিছু সাইড ইফেক্টের কারণে বর্তমানে এটি কোন দেশে ব্যবহার বা বাজারজাত করার জন্য অনুমোদিত নয়। ১২. ল্যাকেসিস (Lachesis) একটি হোমিওপ্যাথি ওষুধ। এটি দক্ষিণ আমেরিকার বুশমাস্টার (Lachesis muta) সাপের বিষ থেকে উদ্ভূত। এর বিষ লোহিত রক্তকণিকাকে দুর্বল করে এবং রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়। অর্থাৎ এটি একটি অ্যান্টিকোয়গুল্যান্ট মেডিসিন। ১৩. ক্রোটেলাস (Crotalus) হলো উত্তর-পূর্ব ব্রাজিলীয় র্যাটলস্নেক (Crotalus durissus terrificus) এর বিষ থেকে প্রাপ্ত উপাদান থেকে তৈরী একটি ব্যথানাশক ঔষধ। এটি ব্যথানাশক হিসাবে মরফিনের চেয়ে প্রায় 30-গুণ বেশি শক্তিশালী! এছাড়াও সায়াটিক, নিউরালজিয়া, মেনিনজাইটিস, টিউবারকিউলোসিস ইত্যাদি রোগ উপশমের হোমিওপ্যাথি ওষুধ তৈরি করতে সাপের বিষ কাজে লাগে। লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে জন্য আর বাড়ালাম না। এতক্ষণে বুঝেই গেছেন সাপের বিষ চিকিৎসা বিজ্ঞানে কতটা গুরুত্বপূরর্ণ! আমাদের উচিৎ বিষধর সাপ সংরক্ষণে সহায়তা করে বিষের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতে ভূমিকা রাখা।
নাবিদ আল জুবায়ের
Facebook প্রোফাইল ↗Organizing secretary, WSRTBD.
এই নিবন্ধের সকল তথ্য জনসচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। সাপে কামড়ের ক্ষেত্রে অবিলম্বে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি জেলা সদর হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।