শীতের মৌসুমে সাপেরা কোথায় হাওয়া হয়ে যায়?
শীতের মৌসুমে সাপের উপদ্রব খুব কম থাকে এটা মোটামুটি সবাই লক্ষ্য করেছি। কিন্তু এই মৌসুমে সাপেরা কোথায় হাওয়া হয়ে যায়? এই মৌসুমে সাপেরা ঘুমিয়ে থাকে! হ্যাঁ...
শীতের মৌসুমে সাপের উপদ্রব খুব কম থাকে এটা মোটামুটি সবাই লক্ষ্য করেছি। কিন্তু এই মৌসুমে সাপেরা কোথায় হাওয়া হয়ে যায়? এই মৌসুমে সাপেরা ঘুমিয়ে থাকে! হ্যাঁ, পুরো শীতের মৌসুম সাপেরা তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকে। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী তাদের শরীরের তাপ দুটি উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করে: এন্ডোথার্মিক প্রাণী, যাদেরকে “উষ্ণ-রক্তের প্রাণী”ও বলা হয়, তারা তাদের নিজের শরীরে তাপ উৎপন্ন করে। মানুষ সহ বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীই এন্ডোথার্ম। আমাদের শরীর হোমিওস্ট্যাসিস নামক একটি বিশেষ জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এর কারণে গ্রীষ্ম বা শীত যাই হোক না কেন, আমরা আমাদের মূল তাপমাত্রা প্রায় 98.6 ডিগ্রি ফারেনহাইটে রাখতে সক্ষম হই। কিন্তু ইক্টোথার্মিক প্রাণী, যাদেরকে “ঠান্ডা-রক্তের প্রাণী” বলা হয়, তারা তাদের শরীরকে উষ্ণ করার জন্য তাপের বাহ্যিক উৎসের উপর নির্ভর করে। একারণেই সাপেরা শীত মৌসুমে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে! একটা গরম রক্তের প্রাণী যেমন মানুষ যখন শীতল পরিবেশে থাকে তখন সে হোমিওস্ট্যাসিস প্রকৃয়ার মাধ্যমে তার শরীর গরম করে সুষম তাপমাত্রায় চলে আসে। কিন্তু তথাকথিত শীতল রক্তের প্রাণী গুলো যখন শীতল পরিবেশের সম্মুখীন হয় তখন তাকে দ্রুত গরম স্থান খুঁজে সেখান থেকে তাপ গ্রহণ করে নিজের দৈহিক তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। শীত মৌসুম আসার আগেই সাপেরা বুঝতে পারে যে শীত শুরু হতে চলেছে এবং তাদের উপর এর প্রভাবও শুরু হয়ে যায়। শীতে যেহেতু ওরা দূর্বল হয়ে যায় তাই শীত শুরুর আগে সাপেরা তার প্রয়োজনের প্রায় দ্বিগুণ খাদ্য গ্রহণ করতে শুরু করে। তাদের শরীরে অনেক অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়। শীতনিদ্রায় সাপেরা খাদ্য গ্রহণ বা শিকার করতে পুরোপুরি অক্ষম হয়ে পরে তখন এই অতিরিক্ত চর্বি থেকেই সাপেরা বেঁচে থাকার শক্তি পায়। এ সময় প্রাণীরা উষ্ণ পরিবেশে অবস্থান করে এবং নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন করে। শীতনিদ্রাকালে এ সকল প্রাণীরা সাধারণ খাদ্য গ্রহণ করে না, রেচন প্রক্রিয়াও বন্ধ থাকে। এ সময়ে সাপেদের হৃৎস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি কমে যায় এবং বিপাক প্রক্রিয়ার হার হ্রাস পায়। শীতনিদ্রার ক্ষেত্রে মেল বা ফিমেলের তেমন লক্ষ্মণীয় কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। এই ৬-৭ সপ্তাহের সময়ে এদের দৈহিক বৃদ্ধি, হজমশক্তি সহ এদের দেহে সংঘটিত সকল রাসায়নিক কার্যক্রমের গতি হ্রাস পায়। একটা কথা বলে রাখি, অনেকেই শীতনিদ্রার ইংলিশ প্রতিশব্দ হিসেবে হাইবারনেশন শব্দটার সাথে পরিচিত। কিন্তু শীতল রক্ত বিশিষ্ট প্রাণীদের ক্ষেত্রে এটা হাইবারনেশন না হয়ে ব্রুমেশন হয়। হাইবারনেশনের নিজস্ব সংস্করণই হলো ব্রুমেশন।ব্রুমেশন ঠান্ডা রক্তের প্রাণীদের জন্য হাইবারনেশন হিসাবে পরিচিত। হাইবারনেশনে প্রাণীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, অপর দিকে সাপ সহ অন্যান্য সরীসৃপেরা যে ব্রুমেশনে থাকে সেটা গভীর ঘুম নয়, হাল্কা ঘুম অথবা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকে। অবস্থা, তাপমাত্রার উপর ভিত্তি করে সাপেরা তাদের ব্রুমেশনে থাকাকালীন সময়ই পানি পান করতে পারে। এমনকি শীত মৌসুমেও অনাকাঙ্ক্ষিত গরম পরলে সাপেরা শিকারও করতে পারে।
ব্রুমেশনের সময় সাপেরা অন্যান্য প্রাণীদের দ্বারা তৈরি গর্তে থাকতে বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এছাড়া গাছের স্তূপ, গুহা এবং বনের গভীরেও অবস্থান করে। ব্রুমেশনের সময় বেঁচে থাকাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। ব্রুমেশন শুরু হওয়ার কোনো সঠিক স্ট্যান্ডার্ড তাপমাত্রা হয়না। কারণ একেক পরিবেশের সাপেদের ব্রুমেশন শুরু হওয়ার তাপমাত্রা একেকরকম। যদি এমন কোনো দেশের সাপের কথা বলা হয় যেখানে সারা বছরই গরম থাকে, সেখানের সাপেরা অল্প ঠান্ডাতেই নিস্তেজ হয়ে যাবে। আবার যদি এমন কোনো এলাকার সাপেদের কথা বলা হয় যেখানে সারাবছর শীত থাকে, সেখানের সাপেদের নিস্তেজ হতে অনেক কম মাত্রার শীত প্রয়োজন। তবে বিভিন্ন পেপারে ব্রুমেশনের গড় তাপমাত্রা দেওয়া আছে ১৬-১৮ সেন্টিগ্রেড। ব্রুমেশন শুরুর আগে থেকেই যেমন সাপেরা সেটা অনুভব করতে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সক্ষম তেমনি ব্রুমেশনের সময় শেষ হওয়ার পূর্বেও তারা সেটা অনুভব করে। সাপেদের ব্রুমেশন হালকা হওয়ার সাথে মিল রেখে নিজেদের থাকার পরিবেশও পাল্টায়। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। ব্রুমেশনের প্রথম স্টেজ এবং মিডল স্টেজে সাপেরা মাটির গর্ত, মানুষের বসতবাড়িতে আশ্রয় নিতে পছন্দ করে। তবে ব্রুমেশনের লাস্ট স্টেজে এরা ওসব অত্যাধিক গরম স্থান থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে । তখন এরা গাছের গোড়া, মাটির ফাটা, সিঁড়ির নিচে ইত্যাদি জায়গায় অবস্থান করে। ব্রুমেশন থেকে বের হয়ে সাপেদের মধ্যে আচরণগত ও দৈহিক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন কিছু পেপার অনুযায়ী এদের ওজন গড়ে ৩-৫% কমে যায়, এদের চামড়া ঢিলা ও ব্যাগি হয়ে যায়, শিকার প্রবণতা বেড়ে যায় তবে স্ত্রী সাপেদের মধ্যে সবথেকে বড় যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় সেটা হলো তারা মেটিং বা মিলনে প্রচন্ডভাবে আগ্রহী হয়ে উঠে। সাপ মোটামুটি অসামাজিক প্রাণী, তবে এই ক্ষেত্রে তারা সামাজিকতা রক্ষা করে। মিলনের মৌসুম ব্যতিত শুধু এই মৌসুমেই সব সাপ মিলনে আগ্রহী হয়। স্ত্রী সাপেরা পরবর্তী ব্রুমেশনের পূর্বেই বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পরিকল্পনা করে, যার ফলে শীত কাল পার হয়ে বসন্তের মাঝামাঝি সময়েই সাপেদের একবার মেটিং সম্পন্ন হয়। জার্নাল অফ অ্যানিমেল ফিজিওলজি অ্যান্ড অ্যানিমেল নিউট্রিশন অনুসারে, পাচনতন্ত্রের পচনশীল খাদ্য রেখে ব্রুমেশনে যাওয়ার ফলে অন্ত্রে প্রভাব পড়তে পারে, যা পরবর্তীতে মারাত্মক হতে পারে। এই রিপোর্ট থেকে আমরা বুঝি ব্রুমেশনে যাওয়ার আগেই সাপেরা এদের পেট খালি করে দেয় এবং পর্যাপ্ত চর্বি এদের শরীরে জমা করে। যেটা দিয়ে ব্রুমেশন পিরিয়ড পার করবে। কোনো কারণে চর্বি জমাতে অক্ষম হলে অথবা চাহিদার তুলনায় কম জমালে ব্রুমেশন পিরিয়ডে তার মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত।
নাবিদ আল জুবায়ের
Facebook প্রোফাইল ↗Organizing secretary, WSRTBD.
এই নিবন্ধের সকল তথ্য জনসচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। সাপে কামড়ের ক্ষেত্রে অবিলম্বে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি জেলা সদর হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।