সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের দেহে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা হলে কী হবে?
সুস্থ দেহে অ্যান্টিভেনোম প্রয়োগ করলে এর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা জানতে হলে আগে জানতে হবে অ্যান্টিভেনোম কী, কীভাবে তৈরী হয় এই অ্যান্টিভেনোম! আমাদের অনে...
সুস্থ দেহে অ্যান্টিভেনোম প্রয়োগ করলে এর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা জানতে হলে আগে জানতে হবে অ্যান্টিভেনোম কী, কীভাবে তৈরী হয় এই অ্যান্টিভেনোম! আমাদের অনেকেরই বিশ্বাস সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনোম তৈরী করা হয়। আসলে বিষয়টা এমন না, সরাসরি সাপের বিষ থেকে না বরং সাপের বিষের সাহায্যে অ্যান্টিভেনোম প্রস্তত করা হয়। প্রতিটা বিষেরই একটি লিথ্যাল ডোজ বা প্রাণঘাতী মাত্রা থাকে। মানুষের ক্ষেত্রে গোখরা সাপের বিষের লিথ্যাল ডোজকে (LD50) ১২ মিলি গ্রাম ধরা হয়। অর্থাৎ কোনো গোখরা সাপ যদি একটি সুস্থ স্বাভাবিক মানুষকে কামড়ে ১২ মিলি বা তার বেশি বিষ প্রয়োগ করে তাহলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিষটাকে প্রতিরোধ করতে পারবেনা এবং এর প্রভাবে রোগীর মৃ*ত্যু হবে চিকিৎসা না করা হলে। তবে যদি সাপটা ১২ মিলির কম বিষ প্রয়োগ করে, তাহলে আমাদের দেহের অনাক্রম্যতন্ত্র কর্তৃক উৎপাদিত অ্যান্টিবডি বিষটাকে প্রতিরোধ করে দিবে। তখন রোগীর দেহে অ্যান্টিভেনোমের প্রয়োজন হবেনা। সমস্যা ঘটে তখনই, যখন কোনো সাপ লিথ্যাল ডোজের বেশি মাত্রায় বিষ প্রয়োগ করে। তখন আমাদের দেহে উৎপাদিত অ্যান্টিবডি অতিরিক্ত মাত্রার বিষ প্রতিরোধ করতে অক্ষম হয়, এবং বাইরে থেকে ফরেন অ্যান্টিবডি আমাদের দেহে ইনজেক্ট করতে হয়। এই অতিরিক্ত অ্যান্টিবডি টা আসে ঘোড়ার রক্ত থেকে। ঘোড়া তুলনামূলক বড় আকৃতির প্রাণী হওয়ায় এর দেহে রক্তের পরিমাণও বেশি। আর যে প্রাণীর দেহে রক্ত যত বেশি সেই প্রাণীর দেহে অ্যান্টিবডি তত বেশি উৎপন্ন হবে। একটি সুস্থ ঘোড়ার দেহে নিয়মিত ভাবে খুব সামান্য পরিমাণে বিষ প্রয়োগ করে অতিরিক্ত অ্যান্টিবডি উৎপাদনে সক্ষম করে গড়ে তোলা হয়৷ এই পদ্ধতিকে মিথ্রিডাটিজম বলে। বিশেষায়িত ঘোড়া গুলির দেহে লিথ্যাল ডোজের কম পরিমাণ বিষ প্রয়োগ করা হয়, যার ফলে ঘোড়া গুলো মা*রা যায় না। তবে ঘোড়ার অ্যান্টিজেন রক্তে প্রোটিন জাতীয় পদার্থ মেশাতে থাকে, যেটাকে অ্যান্টিবডি বলা হয়। ঘোড়ার দেহে বিষ প্রয়োগের ৮-১০ সপ্তাহের মধ্যে ৩-৬ লিটার রক্ত বের করে রক্তের প্লাজমা বা তরল অংশ আলাদা করা হয়, আর রক্ত কণিকা গুলো আবার ঘোড়ার দেহে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ঘোড়ার রক্ত থেকে প্রাপ্ত প্লাজমাকে সেন্ট্রিফিউগেশন, আল্ট্রা ফিল্ট্রেশনের মতো প্রোসেসের মধ্য দিয়ে নিয়ে অ্যান্টিবডি আলাদা করা হয় এবং সেটা মানুষের দেহে প্রয়োগযোগ্য করে বোতলজাত করা হয়। যখন মানুষের নিজস্ব অ্যান্টিবডি ব্যর্থ হয়, তখন বিষ প্রতিরোধে ঘোড়ার দেহ থেকে উৎপাদিত অ্যান্টিবডি প্রয়োগ করা হয়। এটাই মূল প্রক্রিয়া। তারমানে বোঝা গেল সরাসরি সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনোম তৈরী করা হয় না, তবে অ্যান্টিভেনোম তৈরীতে সাপের বিষের সাহায্য নেয়া হয়।
দেহের নিজস্ব অ্যান্টিবডি না হওয়ায় অ্যান্টিভেনোম প্রয়োগ করলে মাঝে মাঝে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুল বুঝতে শুরু করে। সে ভাবে বাইরে থেকে কোনো ক্ষতিকর পদার্থ দেহের রক্তে মিশছে, সেজন্য আমাদের অনাক্রম্যতন্ত্র দেহে কিছু অ্যালার্জেনিক রিঅ্যাকশন তৈরী করে বুঝিয়ে দেয় দেহে ক্ষতিকর কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটছে, দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরী। অ্যালার্জেনিক রিঅ্যাকশনের পাশাপাশি ব্লাড প্রেসার বাড়া, হার্ট বিট বেড়ে যাওয়া বা হুট করে কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, ডায়রিয়া হওয়া, তীব্র জ্বর হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। এই প্রভাব গুলোকে একত্রে অ্যানাফিলেটিক শক বলে। সাধারণত অ্যান্টিভেনোম দেহে প্রবেশের ১০ মিনিট থেকে ৩ ঘন্টার মধ্যেই এই লক্ষণ গুলো সামান্য প্রকাশ পায়, খুব কম ক্ষেত্রে এটি অ্যানাফিলেটিক শকে পরিণত হয়। অ্যান্টিভেনমের সাইডইফেক্ট রোধে AVS ট্রিটমেন্ট শুরুর আগেই ডাক্তার ভিক্টিমকে কটসন, অ্যাভিল, অ্যাড্রিল, অ্যাড্রিনালিন, টিটিভ্যাক্সের মতো প্রয়োজনীয় ইনজেকশন পুশ করে থাকেন। যার ফলে অ্যান্টিভেনোম নেয়ার পর অ্যানাফিলেটিক শক হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সবথেকে বড় কথা হলো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের দেহে অ্যান্টিভেনোম দেয়াই হয় না। অ্যান্টিভেনোম দেয়ার আগে 20-minute Whole Blood Clotting Test (20WBCT) নামক একটি টেস্টের মাধ্যমে রোগীর দেহে বিষের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়ে নেয়া হয়। বিষ উপস্থিত থাকলে তবেই AVS দেয়া হয়। অ্যানাফিলেটিক শক সহ যেকোনো সিরামসিকনেসে মৃ*ত্যুর সম্ভাবনা অনেক কম। সর্বোপরি, বর্তমান উন্নত চিকিৎসার যুগে এ সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
নাবিদ আল জুবায়ের
Facebook প্রোফাইল ↗Organizing secretary, WSRTBD.
এই নিবন্ধের সকল তথ্য জনসচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। সাপে কামড়ের ক্ষেত্রে অবিলম্বে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি জেলা সদর হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।