কয়েক প্রজাতির সাপ নাকি উড়তে সক্ষম! এদের উড়ার পেছনের বিজ্ঞান কী?
ওড়ার সংজ্ঞা পড়তে গিয়ে বিভিন্ন সোর্সে বিভিন্ন ভাবে বিশ্লেষণ পেয়েছি আমি। সবগুলো সংজ্ঞা এক করে যেটা পেলাম তা হলো 'ডানার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতে কোনো প্র...
ওড়ার সংজ্ঞা পড়তে গিয়ে বিভিন্ন সোর্সে বিভিন্ন ভাবে বিশ্লেষণ পেয়েছি আমি। সবগুলো সংজ্ঞা এক করে যেটা পেলাম তা হলো 'ডানার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতে কোনো প্রাণী বা বস্তুর বাতাসে ভেসে থাকাকে ওড়া বলে।' এখন এই ওড়ার আবার অনেক শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শ্রেণি হলো Flapping এবং gliding. আমরা সাধারণত ওড়া বলতে Flapping কেই বুঝি। ওড়া শব্দটা শুনলেই অবচেতন মনে ভেসে উঠে ডানা ঝাপটানো একটি বা একদল পাখির চিত্র। এই ডানা ঝাপটানোকেই Flapping বলে। এটি একটি powered flight. অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে বাতাসে উড়তে গেলে প্রাণী বা বস্তকে অনবরত পাখা ঝাপটানোর মাধ্যমে শক্তি (থ্রাস্ট) প্রয়োগ করে বাতাসে ভেসে থাকতে হয়। powered flight এর আরেকটি উদাহরণ হলো বিমানের টেকঅফ। এখানে বিমানকে ডানা ঝাপটাতে না হলেও অবশ্যই জ্বালানি পুড়িয়ে অধিক পরিমাণে শক্তি উৎপাদন করে বিশালদেহী বায়ূযানকে বাতাসে ভাসাতে হয়। তবে এসব আমাদের আলোচনার মূল বিষয় নয়, এই উদাহরণ গুলো শুধু পরবর্তী আলোচনা টা বোঝানোর স্বার্থে। ওড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো gliding. এটিই আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এই গ্লাইডিংকে ঘিরেই শত-সহস্র বছরে তৈরী হয়েছে নানান জল্পনা-কল্পনা। গ্লাইডিং হলো ওড়ার সেই পদ্ধতি যেখানে প্রাণী বা বস্ত কোনো বাহ্যিক শক্তি প্রয়োগ না করেই একদম মুক্ত ভাবে বাতাসে ভেসে থাকে। কখনো কখনো উড়তে উড়তে পাখির ডানা অবশ হয়ে আসলে পাখি ডানাটা শুধু মেলে রাখে, ঝাপটায় না। তবুও পাখি হুট করে নিচে না পড়ে ধীরে ধীরে নিচে নামে। আবার কাগজের প্লেনকে ছুঁড়ে মারলে সেটি হুট করে নিচে না নেমে ধীরে ধীরে সফ্ট ল্যান্ডিং করে। এগুলো গ্লাইডিং এর উদাহরণ। আমরা বলতে পারি সব গ্লাইডিংই একপ্রকার ওড়া, তবে সব ওড়া অবশ্যই গ্লাইডিং নয়। Gliding, Soaring, Flight, Hovering, Rapid take off, Flapping এরকম ওড়ার অনেকগুলো ধরণের মধ্যে একটি হলো গ্লাইডিং। পাখিরা ডানায় ভর করে উড়তে পারে, সবাই জানি। তবে এমন কিছু প্রাণী আছে যারা ডানা ছাড়াও খুব স্বাচ্ছন্দ্যে বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। এদেরকে 'উড়ুক্কু' প্রাণী বলে। এদের বাতাসে ভেসে থাকতে কোনো বাহ্যিক শক্তির প্রয়োজন হয় না, এমনকি ল্যান্ডিংটাও হয় মাধ্যাকর্ষণ বলের মধ্যমে! যেহেতু ওড়ার সময় এরা ডানা ঝাপটানো বা এজাতীয় কোনো বাহ্যিক শক্তি প্রয়োগ করে না তাই এদের ওড়ার পদ্ধতি টাকে গ্লাইডিং বা ভেসেথাকা বলে। এই উড়ুক্কু প্রাণীদের মধ্যে ৫ প্রজাতির সাপও রয়েছে। আর এই সাপের বাতাসে ভেসে থাকার পদ্ধতি নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা। একটি প্লেটের কথা চিন্তা করুন, প্লেটকে ১০-১২ ফিট উপর থেকে উল্লম্ব ভাবে (vertically) ছেড়ে দিলে তা অতি দ্রুত মাটি স্পর্শ করলেও অনুভূমিকভাবে (horizontally) ছেড়ে দিলে তা বাতাসের সাথে অধিক বাধা পেয়ে তুলনামূলক ধীর গতিতে মাটি স্পর্শ করবে। অর্থাৎ আমরা বুঝতে পারলাম, তলের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ্য বৃদ্ধি পেলে উপর থেকে নিচে পড়ার গতি কমবে। অর্থাৎ দুটো বিষয় একে অপরের সাথে ব্যাস্তানুপাতিক ভাবে সম্পর্কিত। এই পদ্ধতিই কাজে লাগায় সাপ!
উড়ুক্কু প্রাণীদের পেটে সাধারণত কিছুটা অতিরিক্ত চামড়া থাকে, এটাকে প্যাটাজিয়াম বলে। এই প্রাণীদের দৈহিক কাঠামো ভেসে থাকার অনুকূলে হয়। অর্থাৎ বিবর্তনটা এমন ভাবে হয় যাতে পেটে অবস্থিত এই অতিরিক্ত চামড়াকে কাজে লাগিয়ে প্রয়োজন মতো এদের প্রস্থ্য বাড়িয়ে নিতে পারে। উড়ুক্কু সাপেরাও এর ব্যতিক্রম নয়। উড়ুক্কু সাপেদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এরা এদের পাঁজরের হাড়কে (ribs) ইচ্ছে করলেই দুপাশে ছড়িয়ে দিতে পারে। সামান্য অতিরিক্ত চামড়া বা প্যাটাজিয়াম থাকার কারণে সাপের আকৃতিও প্রশস্ত হয়ে যায়। উড়ুক্কু সাপেদের নিয়ে ব্যপক গবেষণার পর মোটামুটি আকারের কিছু তথ্য পাওয়া গেছে তাদের সম্পর্কে। উড়ুক্কু সাপেরা মূলত গাছ থেকে টেকঅফ করে। সাধারণত গাছের ডালের শেষপ্রান্তে গিয়ে মাথাটা নিচে নামাতে থাকে। একসময় লেজে পেঁচিয়ে পুরো দেহকে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেয়। পরবর্তী ধাপে মাথাটা একটু সামনের দিকে উঁচু করে তুলে ধরে। তখন সাপটাকে দেখতে কিছুটা J এর মতো দেখায়৷ গেছ বা অ্যার্বোরিয়াল সাপেদের হার্টের পজিশন কিছুটা পেছনের দিকে থাকে বলে লেজের অংশ সম্পূর্ণ উপরে ঝুলে থাকলেও এই সাপেদের ব্লাড সার্কুলেশন বাধাগ্রস্ত হয় না। সৃষ্টিকর্তা কতোটা সুক্ষ্ম পর্যায়ে সৃষ্টি করেছেন! ভাবলেই অবাক লাগে। J শেপে ঝুলে থাকা অবস্থায় মাথাটা সামনের দিকে সজোরে ছুঁড়ে দেয় উড়ুক্কু সাপ, সেই সাথে আটকে থাকা লেজটাও ছেড়ে দেয়। ফলে বাতাসে ভাসতে থাকে সাপটি। তখনই উড়ুক্কু সাপেদের বিশেষ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এদের রিব্স বা পাঁজরের হাড়গুলোকে দুপাশে ছড়িয়ে দেয়। ফলে আকৃতি প্রশস্ত হয় সাপের। আকৃতি প্রশস্ত হওয়ার ফলে বাতাসের বাধা বেশি পরিমাণ অনুভূত হয় এবং সাপটিও অধিক সময় ভেসে থাকে। ফলে তুলনামূলক বেশি পথ অতিক্রম করতে পারে। গাছের শাখা থেকে বের হয়ে সাপগুলো যখন গতিপ্রাপ্ত হয় তখন এরা একটু অন্যরকম আচরণ করে। বাতাসে এরা ‘S’ আকৃতির রূপ নেয় এবং আনুভূমিকভাবে দু’পাশে তরঙ্গায়িত হতে থাকে। গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, এই তরঙ্গায়িত হবার ফলে যে কম্পনের সৃষ্টি হয় সেটা ১.৩ হার্জের। অর্থাৎ এক সেকেন্ডে ১.৩ বার কম্পন সৃষ্টি হয়। ধারণা করা হয় এরকম দোলন বা তরঙ্গ প্রাপ্ত হবার কারণে কোনো একভাবে সাপের নিজের ভারবহন ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। বাতাসে এই সাপগুলোর গড় গতি প্রতি সেকেন্ডে ৮ মিটার এবং নিচের দিকে নামার সময় এদের গতি হয় সেকেন্ডে ৫ মিটার। এই সাপগুলো ৩০ ডিগ্রি কোণ বরাবর গ্লাইড করে এগিয়ে যায়। এ সাপগুলো নিজেদের যাত্রাপথও পরিবর্তন করতে পারে। সাপের পুরো শরীরের স্পন্দন হয় এটা আগেই বলা হয়েছে। সাপগুলোর মাথার দিক পরিবর্তনের সাথে সাথে এর শরীরের পেছনের অংশ কাত হয়ে যায় এবং দিক পরিবর্তন করে অন্য জায়গায় যায়। এই সাপের এরকম স্পন্দন বা তরঙ্গায়িত হবার বিষয়টি এখনও গবেষকদের কাছে স্পষ্ট নয়। তবুও বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, এ ধরনের সাপের পেছনের ভাগে যে অবতল আকৃতির সৃষ্টি হয় সেটার বাম-ডানে গতি বা স্পন্দনের কারণে সাপের নিচের দিকের অবস্থান পরিবর্তন হয়। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, যদি শরীরের পেছনের অংশ একটু কাত হয়ে একবার বামে এবং একবার ডানে যায়, তাহলে সাপের নিজস্ব ভারোত্তোলন ক্ষমতা বেড়ে যায়, অর্থাৎ শরীরের লিফটিং কাজ করে বেশী। এ তো গেল আসল ফ্লাইং স্নেকের কথা। তবে বেশিরভাগ গেছ সাপই দীর্ঘ্য লাফ দিতে সক্ষম, এক গাছের এক শাখা থেকে অন্য শাখায় লাফালাফি করা এদের নিত্যদিনের কাজ। এই লাফালাফিকে বলা হয় গ্যাপ ক্রসিং। গবেষণায় দেখা গেছে গ্যাপ ফিলিং আচরণ থেকেই ফ্লাইং স্নেকের বিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ এখন যারা ট্রু ফ্লাইং স্নেক, তাদের পূর্বপুরুষেরা এরকম গ্যাপ ফিলিং আচরণ করতো। এখন সেসব সাপ শুধু এক শাখা থেকে অন্য শাখায় লাফালাফিতে সীমাবদ্ধ, ভবিষ্যতে তাদের উড়ুক্কু সাপে পরিণত হওয়া অবশ্যম্ভাবী।
নাবিদ আল জুবায়ের
Facebook প্রোফাইল ↗Organizing secretary, WSRTBD.
এই নিবন্ধের সকল তথ্য জনসচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। সাপে কামড়ের ক্ষেত্রে অবিলম্বে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি জেলা সদর হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।