সাপ কি শিকারের হাড় পর্যন্ত হজম করে ফেলতে পারে? নাকি বমি করে বের করে দেয় অবশিষ্ট হাড়গুলো!
সাপ খাদ্যকে সম্পূর্ণ হজম করতে পারে কিনা এটার উত্তর জানতে হলে ভক্ষণ থেকে শুরু করে মলত্যাগ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া টা বুঝতে হবে৷ মানুষ বা কোনো শিকারী প...
সাপ খাদ্যকে সম্পূর্ণ হজম করতে পারে কিনা এটার উত্তর জানতে হলে ভক্ষণ থেকে শুরু করে মলত্যাগ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া টা বুঝতে হবে৷ মানুষ বা কোনো শিকারী প্রাণীও খাদ্যকে ভক্ষণের পূর্বে একে ছোট টুকরো করে বা চিবিয়ে খাবারকে গলাধঃকরণের উপযোগী করে নেয়। তবে সাপ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী। সাপ খাদ্যকে শিকার করে সরাসরি গিলতে শুরু করে। সাপের দাঁত গুলো কোনো ভাবেই চিবানোর উপযোগী নয়, এগুলোর আঁকড়ার আকৃতির হয়। সাপের দাঁত (aglypha) শুধু শিকারকে শক্ত ভাবে আটকে রাখতে এবং খাবারকে খাদ্যনালীতে ঠেলে দিতে সাহায্য করে। অর্থাৎ সাপ শিকারের পর আস্ত খাবারকে গিলে ফেলে এবং পরিপাক তন্ত্র আস্ত খাবারকেই হজম করতে শুরু করে। খাবার খাদ্যনালী হয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশের পরই শুরু হয় হজমের মূল প্রক্রিয়া। ছোটখাটো হাড় মানুষ নিজেও হজম করতে পারে, তবে সাপের মতো এমন আস্ত প্রাণী গিয়ে খেলে এর হাড় মানুষের পক্ষে হজম করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। আর খাদ্যের আকৃতি বড় হলে তো এর হাড় হজম করা মানুষের পক্ষে অসম্ভবই বলা চলে। তাহলে সাপেরা এত সহজে কীভাবে খাদ্যের হাড় সহ হজম করে ফেলে!? সাপের পাকস্থলীতে শিকারের হাড় সহ পুরো দেহটা হজমের পেছনে মূলত ৩ টি অনুঘটক কাজ করে। ১. পাকস্থলীর অম্ল (acid) এবং উৎসেচক (enzymes) গুলোর মিশ্রণ: সাপের পাকস্থলী প্রাণীজগতের অন্যান্য পাকস্থলীর মতোই খাদ্যকে ভেঙে ফেলার জন্য অম্ল (হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড) এবং পাচকতন্ত্র উৎসেচকের একটি মিশ্রণ ক্ষরণ করে। সাপের একটি অগ্ন্যাশয়, একটি যকৃৎ এবং একটি পিত্তথলি রয়েছে যা অন্ত্রে হজমকারী এনজাইমগুলি নিঃসরণ করে। সাপের পাকস্থলীর এসিড খাবারকে ভেঙে ফেলে। অপরদিকে প্রোটিন, ফ্যাট এবং কার্বোহাইড্রেটকে আরও ভালোভাবে পরিপাক করার জন্য সাপেরা শক্তিশালী এনজাইমের মিশ্রণ ব্যবহার করে। জার্নাল অফ এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজি অনুসারে, একটি অজগর একবার তার খাবার খেয়ে ফেললে তার পাকস্থলীর অ্যাসিডের পিএইচ মান 7.5 হয়। ১৮ ঘন্টা পরে পিএইচের স্তর মাত্র 2 এ নেমে আসে এবং ধীরে ধীরে আরো কমে 1. 5এ স্থির হয়। খাবারটি ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছানোর উপযোগী হয়ে ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছানো পর্যন্ত পাকস্থলীর এসিডের পিএইচ মান অপরিবর্তিত থাকে। অর্থাৎ খাবারটি অতিউচ্চ মাত্রার এসিডে নিমজ্জিত থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত এটি তরল বা নরম হয়ে ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছাচ্ছে! ২. পেশিবহুল শক্তিশালী পাকস্থলী: সাপের পরিপাকতন্ত্র অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় বেশি পেশীবহুল। পুরো পাকস্থলী শক্তিশালী পেশীর দেয়াল দ্বারা বেষ্টিত থাকে। খাবারকে মন্থন করার জন্য এটি প্রতিনিয়ত সংকুচিত ও প্রসারিত হতে থাকে। এই পেশীগুলির সংকোচন-প্রসারণ এক অর্থে চিবানোর মতোই কাজ করে। এর ফলে অ্যাসিড এবং এনজাইমের সংস্পর্শে থাকা তুলনামূলক নরম খাবার গুলো দ্রুত ভাঙতে শুরু করে। এটি সম্পূর্ণ হজমের জন্য অপরিহার্য প্রক্রিয়া। কারণ শিকারের হাড়কে পরিপাক করার আগে এর দেহের তুলনামূলক নরম অংশ যেমন চামড়া-মাংস হজম করতে হবে। ৩. খাদ্য পাকস্থলীতে থাকার সময়ের দৈর্ঘ্য: খাবারের আকারের উপর নির্ভর করে এটি কতসময় পাকস্থলীতে থাকবে। যতক্ষণ পর্যন্ত খাদ্য তরল বা নরম হয়ে ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছানোর উপযোগী না হবে ততক্ষণ পর্যন্তই এটি পাকস্থলীতেই থাকবে। পুরো সময় জুড়ে খাদ্য পাকস্থলীর অ্যাসিডে নিমজ্জিত থাকে । মানুষের পাকস্থলীতে খাবার ২-৬ ঘন্টা পর্যন্ত থাকলেও সাপেদের পাকস্থলীতে খাবারের আকৃতি ভেদে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত পাকস্থলীতে থাকতে পারে।
সাপেরা খাবার গলাধঃকরণের সময় মাথা থেকে গিলতে শুরুকরে, এজন্য শিকারের মাথাই প্রথমে হজম হয় সাপের পাকস্থলীতে। মাথার খুলির হাড় থেকে শুরু করে দেহের কিছু অংশ পর্যন্ত গলে যাওয়ার পরে ওই অংশটুকু ক্ষুদ্রান্ত্রে চলে যায়। দোহের অবশিষ্ট অংশ এবং পায়ের অংশটুকু ধীরে ধীরে গলতে শুরু করে। এই অংশ পুরোপুরি গলে গেলে এটুকুও ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছে এবং আরো কিছু এনজাইমের সংস্পর্শে এসে পুরোপুরি পরিপাক হয়ে যায়। হজম হওয়া হাড়গুলি সাপের জন্য ক্যালসিয়াম এবং অন্যান্য খনিজ উপাদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। হজমের জন্য তাপ একটি অতিপ্রয়োজনীয় উপাদান। সাপেরা ইক্টোথার্মিক ও পোইকিলোথার্মিক হওয়ায় নিজের দেহের তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা এবং তাপ বৃদ্ধি বা কমানোর জন্য বাইরের পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। যেহেতু হজমের ক্ষেত্রে তাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, সেজন্য সাপেরা খাবার গ্রহণের পর সূর্যের তাপকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত খাবার হজমের জন্য বাইরে রোদে শুয়ে থাকে। বড় আকৃতির খাবার হলে বেশি পরিমাণ এসিড, এনজাইমস উৎপাদন করতে গিয়ে এবং হজমের সাথে সম্পর্কযুক্ত পেশিগুলোর অতিরিক্ত নড়াচড়ার ফলে সাপেদের অনেক শক্তিক্ষয় হয় এবং এরা দূর্বল হয়ে পড়ে। এসময় সাপেরা অক্সিজেন গ্রহনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। শিকারের পর সাপেরা খাবার হজমের জন্য রৌদ্রে বের হলে সাধারণ মানুষ না বুঝে একে মারতে উদ্যত হয়। সাপেরা এমন অবস্থায় অস্থির হয়ে পেটের খাদ্য বের করে দিয়ে পালানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে বিষধর সাপেরা নিজের বিষের মাধ্যমে শিকারকে ভক্ষণের পূর্বেই হজম করতে শুরু করে। সাপের বিষ খাদ্যের কোষ ধ্বংস করতে থাকে, যা হজমের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এজন্য বিষধর সাপ গুলো খাদ্য হজমের জন্য সূর্যের তাপের উপর তুলনামূলক কম নির্ভরশীল। তবে সাপের পাকস্থলীতে কাইটিন এবং কেরাটিন প্রোটিনেসিয়াস উপাদান (যেমন: চুল, নখর/আঙ্গুলের নখ, আঁশ, খুর, পোকামাকড়ের এক্সোস্কেলটন, পালক, পশম) হজম না হয়ে অপরিবর্তিত অবস্থাতেই নির্গত হয়। মানুষের পাকস্থলীও কাইটিন এবং কেরাটিন প্রোটিনেসিয়াস উপাদান গুলো হজমে অক্ষম। কেরাটিন ভাঙতে অনেক বেশি তাপের প্রয়োজন হয়। ফলে এটি সাধারণত হজম হয়না প্রাণীজ শরীরে। খাবার গ্রহন থেকে শুরু করে পুষ্টি উপাদান সংগ্রহের পর তা বর্জ্য রূপে বেরিয়ে আসা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি অতিসূক্ষ্ণ। একটি আর্টিক্যালে আসলে বিস্তারিত লেখা সম্ভবও নয়। তবে আশা করি বিষয়টা বোধগম্য করে উপস্থাপন করতে পেরেছি।
নাবিদ আল জুবায়ের
Facebook প্রোফাইল ↗Organizing secretary, WSRTBD.
এই নিবন্ধের সকল তথ্য জনসচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। সাপে কামড়ের ক্ষেত্রে অবিলম্বে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি জেলা সদর হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।