সচেতনতা ও গাইড ⏱️ 4 মিনিটের পাঠ 👁️ 180 বার পঠিত

সাপ আমাদেরকে কেমন দেখে? রঙিন দেখে নাকি সাদাকালো দেখে?

সরীসৃপের চোখের গঠন পুরোপুরি আমাদের মতো না। শক্ত হাড়ের গোলকের মাঝে এদের চোখ অবস্থিত। চারপাশের হাড়গুলো চোখের সুরক্ষায় কাজে লাগে। এদের চোখের কোনো পাতা থা...

নাবিদ আল জুবায়ের
নাবিদ আল জুবায়ের
সাপ আমাদেরকে কেমন দেখে? রঙিন দেখে নাকি সাদাকালো দেখে?

সরীসৃপের চোখের গঠন পুরোপুরি আমাদের মতো না। শক্ত হাড়ের গোলকের মাঝে এদের চোখ অবস্থিত। চারপাশের হাড়গুলো চোখের সুরক্ষায় কাজে লাগে। এদের চোখের কোনো পাতা থাকেনা, ফলে সূর্যের আলো সরাসরি এদের চোখেই পরে। এরা চোখ বন্ধ করতে অক্ষম, ফলে যেকোনো ক্ষতিকর বস্তু চোখের ক্ষতি করতে পারে। তবে হালকাপাতলা চোখের ক্ষতি বাঁচাতে এদের চোখের উপর একটা আবরণ তৈরী হয়, যেটাকে স্পেক্টেক্যাল স্কেল বলে। সাপ প্রতিবার খোসা পাল্টানোর সময় খোসার সাথে সেই আবরণটাও খুলে আসে চোখ থেকে, পরে আবার তৈরী হয়। সাপ পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন প্রাণী। আজ থেকে ১৫ কোটি বছর আগে এই প্রাণীটার পথচলা শুরু হয়েছিলো পৃথিবীর বুকে, তারপর থেকে লক্ষ বছর এরা মাটির নিচের প্রাণী ছিলো। মাটির নিচেই চলাচল করতো। তখন মাটির কণা থেকে বাঁচতে তাদের চোখের এই আবরণটা বিবর্তীত হয়েছিলো, যা এখনো অপরিবর্তিত অবস্থাতেই আছে। সাপেরা মানুষের মতো এদের চোখের মনি নড়াচড়া করাতে পারেনা, ফলে আশেপাশের কিছু দেখতে হলে পুরো মাথাই ঘুরিয়ে দেখতে হয়। চোখে দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কোনো আলো ঢুকলে সেটা চোখের পিছনে অবস্থিত রেটিনায় গিয়ে পরে। রেটিনা রড (rod cell) এবং কোণ (cone cell) নামক লক্ষ লক্ষ আলোক সংবেদনশীল কোষ দ্বারা আবৃত। যখন এই কোষগুলি আলো শনাক্ত করে, তখন তারা মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। মস্তিষ্ক সেই সংকেত গুলো প্রক্রিয়াজাত করে আমাদের দেখার অনুভূতি যোগায়। আমরা চোখ দিয়ে এতো আলো-অন্ধকার, ছোট-বড় দৃশ্য দেখি তার সবই ঘটে এই রড এবং কোণ নামক কোষ গুলোর সাহায্যে। সাপেদের চোখেও এই কোষ দুটি উপস্থিত। তারমানে এই বিশেষ আলোকসংবেদী কোষ দুটির কার্যপ্রণালী জানলেই আমরা মোটামুটি ধারণা পেয়ে যাবো সাপ কীভাবে পৃথিবীকে দেখে, প্রকৃতিকে উপভোগ করে! প্রথমে রড কোষ (rod cell) নিয়ে আলোচনা করি। রড কোষ আলো শনাক্ত করে এবং এটিকে নিউরনে ইলেক্ট্রো-কেমিক্যাল ইমপালসে রূপান্তর করে। আলোর উপস্থিতি এবং এর অনুপস্থিত তথা অন্ধকার শনাক্তে তাৎক্ষণিক সক্রিয় থাকে এই রড কোষ। রড কোষ আবছা বা মৃদু আলোতে আমাদের সাদাকালো দৃশ্য দেখার অনুভূতি প্রদান করে। এবার অক্ষিপটের পরবর্তী কোষ টার কাজ জানুন। আক্ষিপট বা রেটিনার ২ টি আলোক-সংবেদী কোষের মধ্যে কোণ কোষ (cone cell) আমাদের সুন্দর পৃথিবীকে রঙিণ করে, আমাদের অবলোকন অনুভূতিকে রঙিণ করে। এই ফটো-রিসিপ্টর সেল গুলো বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শনাক্ত করে এদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে এবং বস্তু হতে প্রতিফলিত ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বিভিন্ন রংএ আমাদের অবলোকন অনুভূতিতে উপস্থাপন করে। এই কোষ উচ্চ আলোতে কাজ করার জন্য বিশেষায়িত। বস্তুর স্থানান্তর, নড়াচড়া, স্থির ও সক্রিয় বস্তুর পার্থক্যকরণে কোণ কোষ (cone cell) কাজ করে। তাহলে বুঝতেই পারছেন সাপ রঙিণ বস্তু দেখতে পায়, এদের দর্শন অনুভূতি রঙিণ এবং এরা আলো অন্ধকারের পার্থক্য করতে পারে। কিন্তু এরা রঙিণ দৃশ্য দেখলেও সেটা মানুষের থেকে কিছুটা ভিন্ন এবং মানুষের তুলনায় কম রং দেখতে সক্ষম এরা। উপরে জেনেছেন, কোণ কোষের (cone cell) কাজ রঙিণ দৃশ্যের অনুভূতি প্রদাণ করা, তবে এই অনুভূতি প্রদানের প্রক্রিয়া টা জানানো হয়নাই। মানুষের অক্ষিপটের যে কোণ কোষ গুলো আছে সেগুলো ৩ শ্রেণীর ফ্রিকোয়েন্সী শনাক্ত করতে সক্ষম। উচ্চ কম্পাঙ্ক তথা নীল রং, মধ্য কম্পাঙ্ক তথা সবুজ রং এবং নিম্ন কম্পাঙ্ক তথা লাল রং। অর্থাৎ মানুষ সৃষ্টিজগতে যা দেখে সবই লাল, সবুজ আর নীল রঙের আনুপাতিক মিশ্রণ। এই তিনটি রং মানুষের ভিশনের প্রাইমারি কালার। কিন্তু সাপের রেটিনাতে যে কোণ কোষ (cone cell) গুলো আছে সেগুলো দুইটি ফ্রিকোয়েন্সী শনাক্তে সক্ষম। এরা উচ্চ কম্পাঙ্ক তথা নীল রং এবং মধ্যম কম্পাঙ্ক তথা সবুজ রং দেখতে পারে, লাল রংএর লোয়ার ফ্রিকোয়েন্সী এরা শনাক্ত করতে পারেনা। লাল এবং সবুজের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়ে অক্ষম সাপেরা। এরা দৃষ্টি অনুভূতিতে যত প্রকার রং দেখে সবগুলো রংই সবুজ আর নীল রংএর আনুপাতিক মিশ্রণ।

যে সাপগুলো ডায়ার্ণাল অর্থাৎ দিনে শিকার করে তাদের চোখে একটা বিশেষ লেন্স থাকে, যেটা অতি বেগুনি রশ্মিকে ফিল্টার করে। এটা তাদের চোখে সানগ্লাসের কাজ করে। এই লেন্সের রং হলুদ হওয়ায় দিবাচর সাপেদের চোখে হলুদাভ রঙের রিং দেখা যেতে পারে। ইউভি লাইট ফিল্টার করার ফলে এরা দিনে খুব স্পষ্ট ও ভালো দেখতে পায়। তবে রাতে এদের ভিশন সেন্স খুবই বাজে হয়ে যায়, রাতে এরা তেমন ভালো দেখতে পায়না। ইউভি লাইট ফিল্টার লেন্সের জন্য কিছুটা রাতে সানগ্লাস পরে থাকার অনুভূতি পায়। গবেষকদের মতে প্রাচীন যুগে সাপের অস্তিত্ব শুরু হওয়ার দিকে সব সাপেদেরই এই অতিরিক্ত লেন্স টা ছিল। আমাদের দেশের কালনাগিনী সাপ এমন চেখের উদাহরণ। আবার যে সাপগুলো নকটার্ণাল অর্থাৎ নিশাচর তাদের কোনো অতিবেগুনী রশ্মি প্রতিরোধক থাকেনা, দিনে অতি বেগুনী রশ্মির প্রভাবে এরা ভালোভাবে দেখতে পায়না কিছু, অতিরিক্ত আলোক পরিবেশ মনেহয় তাদের কাছে। তবে রাতে এরা বেশ পরিষ্কার আর স্পষ্ট দেখতে পায়। সাপেদের চোখের তারারন্ধ্র বা পিউপিলের আকৃতির উপর ভিত্তি করেও এদের অবলোকন অনুভূতুতির পার্থক্য হয়। সাপেদের কয়েক আকৃতির তারারন্ধ্র দেখা যায়, elliptical বা অর্ধগোলক, vertical বা উলম্ব, horizontal বা অনুভূমিক এবং সাধারণত যেটা দেখা যায় সেটা circle বা গোলাকৃতির। চোখের পিউপিল অর্ধগোলক হলে তারা সাধারণ সাপেদের থেকে নির্দিষ্ট দিকে সামান্য বেশি ফোকাস করতে পারে, তবে এদের সাইড ভিউইং রেঞ্জ কিছুটা কমে যায়। যাদের চেখের পিউপিল উলম্ব তারা উপর এবং নিচ থেকে আসা যেকোনো শিকার খুব সহজে দেখতে পারে। নির্দিষ্ট বস্তুতে খুব ভালো ফোকাস রাখতে পারে, সামনের বস্তু ব্যতিত সেভাবে ফোকাস দিতে পারেনা আশেপাশে। এরা অ্যাম্বুশ হান্টার হয়, অর্থাৎ খুব ধীরে ধীরে শিকারের মুভমেন্টের ওপর নজর রেখে শিকার কিছু বুঝে ওঠার আগেই হুট করে আক্রমণ করে বসে৷ ভাইপার প্রজাতির সাপেরা এমন পিউপিলের উদাহরণ। আবার যারা অনুভূমিক তারারন্ধ্রের অধিকারী তাদের উপর-নিচে ভালো দেখে না, এরা সামনে এবং দুই পাশে খুব ভালো ফোকাস রেখে শিকার করতে পারে। এরাও অ্যাম্বুশ হান্টার হতে পারে। আর যারা স্বাভাবিক গোলাকার পিউপিলের অধিকারী তারা সামনে এবং দুই পাশে নির্দিষ্ট ভিউইং অ্যাঙ্গেলে মোটামুটি সমান ভাবেই নজর রাখতে সক্ষম। আবার কিছু প্রজাতির সাপের একটা সুপার পাওয়ার থাকে, তারা চোখে দেখার পাশাপাশি তাপ অনুভব করেও দেখতে সক্ষম। মজার বিষয় হলো কোনো কারণে যদি চোখ দুটো নষ্টও হয়ে যায়, তাও তাপ শনাক্তের মাধ্যমে শিকার করে বাকি জীবণ পার করে দিতে পারবে। একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন, এটা অনেক বড় একটা সুপার পাওয়ার! পিট ভাইপার, বোয়া এবং পাইথন প্রজাতির সাপেদের মুখে কিছু গর্ত থাকে, যেটাকে পিট অর্গ্যান বলা হয়। এই পিট অর্গ্যান গুলো প্রজাতি ভেদে মুখের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থিত। যেমন পিট ভাইপারদের ক্ষেত্রে নাক এবং চোখের মাঝে পিট অর্গ্যান থাকে। এদেরকে লরিয়্যাল পিট অর্গ্যান বলে। দুই সাইডে দুইটা পিট অর্গ্যান থাকে এদের। আবার যদি বোয়া বা পাইথনদের ক্ষেত্রে দেখি তাহলে এদের উপরের ঠোঁট এবং নাকের মাঝে বেশ কয়েকটা ফুটো লক্ষ্য করা যায়, যেগুলো পিট অর্গ্যান। এগুলোকে ল্যাবিয়্যাল পিট অর্গ্যান বলে। যেকোনো গরম বস্তু অবলোহিত বর্ণালী তৈরী করে, যেটা একটা বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ। আমরা মানুষেরা খালি চোখে এই বিকিরণ বা রেডিয়েশন দেখতে পাইনা, কারণ এটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আমাদের দৃশ্যমান আলোর চেয়ে অনেক বেশি। তবে যেসকল সাপেদের পিট অর্গ্যান আছে তারা এই তরঙ্গটা পিট অর্গ্যানের মাধ্যমে গ্রহণ করে সেটাকে আলোক চিত্র আকারে অনুভব করে। ৫ থেকে ৩০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে যেকোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো এরা দেখতে সক্ষম পিট অর্গ্যানের মাধ্যমে। এই অর্গ্যান গুলো এতোটাই সেন্সিটিভ হয় যে সর্বনিম্ন ০.০০১° সেন্টিগ্রেডের তাপমাত্রার তারতম্যও ধরে ফেলতে পারে অনায়াসে! ইনফ্রারেড আলো হওয়ায় অধিক তাপীয় বস্তুকে লাল রং করে পৃথকভাবে উপস্থাপন করা হয় পিট অর্গ্যান যুক্ত সাপের সামনে, তাই সে খুব সহজেই পার্থক্য করে ফেলে! শুরুতে ভাবা হতো এই পিট অর্গ্যান শুধুমাত্র সাপেদের খাদ্য শিকারের কাজেই ব্যবহৃত হয়, তবে সম্প্রতি গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। হ্যাঁ, খাদ্য শিকারের ক্ষেত্রে পিট অর্গ্যান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে এটা ঠিক; বিশেষ করে রাতে সম্পূর্ণ অন্ধকারেও অকল্পনীয় দক্ষতায় শিকার করতে সক্ষম পিট অর্গ্যান সংবলিত সাপেরা। কোনো গরম রক্ত বিশিষ্ট প্রাণী এর পিট অর্গ্যানের রেঞ্জের মধ্যে চলে আসলেই এরা স্পষ্ট বুঝে ফেলে সেটা। তবে পিট ভাইপার এই মহাশক্তিকে ভিন্ন ভাবেও ব্যবহার করে। অতিরিক্ত তাপের আবহাওয়ায় ঠান্ডা স্থান খুঁজতে অথবা অতিরিক্ত ঠান্ডা আবহাওয়ায় গরম স্থান খুঁজতে জীবণ প্রদায়ী অঙ্গ হিসেবে এটি কাজ করে। এই ছিলো সাপের অবলোকন অনুভূতি সম্পর্কে বিস্তারিত। সবগুলো ছবি অ্যাপে সংযোজন করতে না পারায় দুঃখিত।

নাবিদ আল জুবায়ের

নাবিদ আল জুবায়ের

Facebook প্রোফাইল ↗

Organizing secretary, WSRTBD.

সাপ ও বন্যপ্রাণী - রেসকিউ বিডি
Google Play Google Play থেকে ফ্রি নামান ★ ৪.৯ রেটিং • সম্পূর্ণ বিনামূল্যে
⚕️ জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা

এই নিবন্ধের সকল তথ্য জনসচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। সাপে কামড়ের ক্ষেত্রে অবিলম্বে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি জেলা সদর হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।

সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় নিবন্ধ

সবগুলো দেখুন →