আলফা নিউরোটক্সিন (α-neurotoxin) বা পোস্ট-সিন্যাপ্টিক নিউরোটক্সিন, বিটা নিউরোটক্সিন (β-neurotoxin) বা প্রি-সিন্যাপ্টিক নিউরোটক্সিন, এবং এদের কার্যপ্রণালি নিয়ে কিছু আলোচনা।
গোখরা ও কালাচ উভয়ই নিউরোটক্সিন বিষধারী সাপ। কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে, এদের দুজনের বিষের নিউরোটক্সিনই কি একই রকম? যদি ভেরিয়েশন থাকে তাহলে কোনটা কীভাবে ক...
গোখরা ও কালাচ উভয়ই নিউরোটক্সিন বিষধারী সাপ। কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে, এদের দুজনের বিষের নিউরোটক্সিনই কি একই রকম? যদি ভেরিয়েশন থাকে তাহলে কোনটা কীভাবে কাজ করে? কেনই বা কালাচের বিষ গোখরার চাইতে অধিক লিথাল? এসব কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই আলোচনা। সম্পূর্ণ পোস্টটা বোঝার জন্য আগের থেকে খুব বেশি কিছু জানার প্রয়োজন নেই। নিউরোটক্সিন যে ভিক্টিমের স্নায়ুর উপর কাজ করে এতটুকু জানলেই চলবে। আর স্নায়ুকোষ বা নিউরন সম্পর্কে হালকা ধারণা থাকলেই যথেষ্ট হবে। আমাদের সারা শরীরে জালের মত ছড়িয়ে আছে স্নায়ুতন্ত্র। এই স্নায়ুতন্ত্রের বিশেষ একধরণের কোষকে বলে নিউরন। একটা নিউরন কখনও অন্য একটা নিউরনের সাথে, কখনও একটা গ্রন্থিকোষের সাথে, কখনও বা একটা পেশিকোষের সাথে যুক্ত হয়। যার সাথেই যুক্ত হোক না কেন, এই যুক্ত হওয়ার স্থান বা জাংশন পয়েন্টগুলোকে বলে সিন্যাপ্স। আমাদের আগ্রহ এই সিন্যাপ্স কে নিয়ে, বা আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে নিউরোমাস্কুলার জাংশন পয়েন্টগুলোর সিন্যাপ্সে, যেখানে একটা নিউরন গিয়ে একটা পেশিকোষের সাথে যুক্ত হয়। নিউরোটক্সিক বিষের প্রধান কর্মক্ষেত্র এই জায়গাটা। নিউরনগুলো একটা আরেকটার সাথে যুক্ত হয়ে শুধু বসে থাকলেই হবে না, একে অন্যের সাথে সংকেতও আদান প্রদান করতে হবে। তাহলে প্রতিটা সিন্যাপ্সের দুই পাশে আমরা দুইটা কোষ পাচ্ছি, যাদের একজন সংকেত পাঠাবে, এবং অন্যজন সংকেত গ্রহন করবে। খুব সহজ ভাষায়, সংকেত যে পাঠাবে, তাকে আমরা বলব প্রি-সিন্যাপ্টিক অংশ, এবং সংকেত যে গ্রহন করবে তাকে আমরা বলব পোস্ট-সিন্যাপ্টিক অংশ। নিউরোমাস্কুলার জাংশনের ক্ষেত্রে নিউরন পেশির কাছে সংকেত পাঠাবে। তাই নিউরন হবে প্রি-সিন্যাপ্টিক অংশ, পেশিকোষ হবে পোস্ট-সিন্যাপ্টিক অংশ। নিউরোটক্সিক বিষ যদি প্রি-সিন্যাপ্টিক অংশে কাজ করে, তাহলে সেই বিষকে বলা হয় প্রি-সিন্যাপ্টিক নিউরোটক্সিন বা বিটা নিউরোটক্সিন, এবং বিষটা যদি পোস্ট-সিন্যাপ্টিক অংশে কাজ করে, তাহলে তাকে বলা হয় পোস্ট-সিন্যাপ্টিক নিউরোটক্সিন বা আলফা নিউরোটক্সিন। এখানে একটা স্পয়লার দিয়ে রাখি, প্রি-সিন্যাপ্টিক বা বিটা নিউরোটক্সিন বিষ এর পোস্ট-সিন্যাপ্টিক বা আলফা ভেরিয়েশনের চাইতে বেশি ভয়ানক ও ক্ষতিকর। গোখরো সাপের বিষে আলফা নিউরোটক্সিন পাওয়া যায়, অন্যদিকে কালাচের বিষে আলফা ও বিটা দুই ধরণের নিউরোটক্সিনই পাওয়া যায়। আলফা-বিটার ভেরিয়েশনে যাওয়ার আগে নিউরোটক্সিনের কমন কার্যপ্রণালী নিয়ে কিছু আলোচনা করি। এখানে একটু বলে রাখি, ১৪-১৫ রকমের নিউরোটক্সিক বিষ হতে পারে এবং তাদের কাজ করার ধরনও আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমরা সাপের বিষের সাথে যেটা আসে, শুধু সেটা নিয়েই আগাবো। আমাদের হাঁটাচলা, খাওয়া-দাওয়া, শ্বাস-প্রশ্বাস, দেখা ও শোনা সহ অসংখ্য কাজের জন্য পেশি নড়াচড়া করাতে হয়। কিছু পেশি আছে ঐচ্ছিক, যেগুলো আমরা নিজ ইচ্ছায় নাড়াতে পারি, আবার কিছু আছে অনৈচ্ছিক, যেগুলোর নড়াচড়া ইন্টারনালি নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্ত পেশি যেমনই হোক না কেন, নড়াচড়ার জন্য স্নায়ুতন্ত্র থেকে ওই পেশিতে সংকেত আসতেই হবে। স্নায়ুতন্ত্রে এরকম সংকেত হতে পারে দুই ধরণের, ইলেক্ট্রিক সিগন্যাল এবং কেমিক্যাল সিগন্যাল। নিউরন থেকে পেশিকোষে সংকেত সাধারণত আসে কেমিক্যালের মাধ্যমে। এই কেমিক্যালকে বলে নিউরোট্রান্সমিটার। আমরা যদি নিউরন থেকে পেশিকোষে নির্দিষ্ট কাজের জন্য প্রয়োজনীয় নিউরোট্রান্সমিটারের আসায় ব্যাঘাত ঘটাই, তাহলে ওই পেশিতে প্যারালাইসিস হবে। নিউরোটক্সিক বিষ এই কাজটিই করে। কয়েকটি উদাহরণ দেই। ১। চোখের অকুলার পেশির নড়াচড়ায় ব্যাঘাত ঘটলে চোখের পর্দা একটু নেমে আসবে, চোখ স্থির হয়ে যাবে, লেন্স তার প্রয়োজন অনুযায়ী ফোকাস করতে পারবে না, ফলে ডাবল-ভিশন সমস্যা হবে, বা ঘোলা দেখবে। ২। মুখ ও গলার পেশি নড়াচড়ায় সমস্যা হলে ভিক্টিম ঠিকমত কথা বলতে পারবে না, কথা জড়িয়ে যাবে, মুখ দিয়ে লালা পড়বে। ৩। হৃদপিন্ডের পেশির কাজে সমস্যা হলে হার্ট ফেইলার বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে (যদিও এই কাজ আরো বিশেষভাবে করার জন্য সাপের বিষে কার্ডিওটক্সিন থাকে)। ৪। শ্বসনতন্ত্র বা ফুসফুসের পেশি নড়াচড়ায় সমস্যা হলে রক্তে অক্সিজেন কমে যাবে, তখন প্রথমদিকে ভিক্টিম খুব ঘনঘন শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলবে। পরে আস্তে আস্তে পেশি নড়াচড়া আরও বন্ধ করে দিলে ভিক্টিম দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে। ৫। হাত-পা বা শরীরের অন্যান্য পেশি নড়াচড়া না করতে পারলে ভিক্টিম হাঁটাচলায় অক্ষম হয়ে যাবে। এখানেই শেষ না, তবে এগুলো সবই গোখরো বা কালাচের কামড়ের লক্ষন। আর এদের বিষে বেশিরভাগ সময় কারও মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় শ্বসনতন্ত্রের প্যারালাইসিস, দম বন্ধ হয়ে যাওয়া।
আগেই বলা হয়েছে, পেশি নড়াচড়ার জন্য প্রি-সিন্যাপ্টিক অংশের নিউরন থেকে পোস্ট-সিন্যাপ্টিক অংশের পেশিকোষে নিউরোট্রান্সমিটার যাবে। এই নিউরোট্রান্সমিটার কখনও হতে পারে সোডিয়াম আয়ন, কখনও হতে পারে ক্যালসিয়াম আয়ন, আবার কখনও হতে পারে অ্যাসিটাইলকোলাইন (ACh) নামের এক যৌগ। এক এক ধরণের নিউরোটক্সিন এক এক ধরণের ট্রান্সমিটারের যাতায়াতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ACh হচ্ছে সবচেয়ে কমন এবং সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নিউরোট্রান্সমিটার। আর গোখরো বা কালাচের বিষ মূলত এই ACh এর যাতায়াতেই ব্যাঘাত ঘটায়। তো এই ব্যাঘাত ঘটানো যেতে পারে দুই ভাবে। ১। নিউরন থেকে ACh বের হওয়ার পর তা পেশিকোষের দেয়ালের রিসেপ্টরে বসতে বাধা দেওয়া যেতে পারে। ২। নিউরনে ACh এর সংরক্ষণ বা উৎপত্তিই বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে, পেশিকোষ পোস্ট-সিন্যাপ্টিক অংশে অবস্থিত, তাই এ ধরণের বাধা আসবে আলফা নিউরোটক্সিনের থেকে। ACh কণা গিয়ে পেশিকোষের যে রিসেপ্টরগুলোতে বসত, আলফা নিউরোটক্সিনের কণাগুলো আগেই গিয়ে ওই জায়গাগুলো দখল করে বসে থাকবে। তাই প্রয়োজনের সময় ACh কণা গিয়ে পেশির দেয়ালে বসার জায়গা পাবে না। ফলে পেশি আর স্নায়ুতন্ত্র থেকে সংকেতও পাবে না, নড়াচড়াও করতে পারবে না। ভালো খবর এই যে, আলফা নিউরোটক্সিন কণাগুলো পেশির দেয়ালে অত শক্তভাবে বসে না, তাই শুধু দ্রুত অ্যান্টিভেনম নেওয়ার মাধ্যমেই এই ক্ষতি সম্পূর্ণভাবে রিভার্স করা যায়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, নিউরন প্রি-সিন্যাপ্টিক অংশে অবস্থিত, তাই এ ধরণের বাধা আসবে বিটা নিউরোটক্সিনের থেকে। নিউরোট্রান্সমিটারগুলো সংরক্ষণ করে রাখার জন্য নিউরনে এক ধরণের ভেসিকল বা গর্ত থাকে, যাকে বলে সিন্যাপ্টিক ভেসিকল। বিটা নিউরোটক্সিন এই ভেসিকলগুলো ধ্বংস করে দেয়। তাই প্রয়োজনের সময় নিউরন আর সংকেত পাঠাতে পারে না। ভেসিকলই নেই, ট্রান্সমিটার পাবে কোথায়। প্রথম দিকে নিউরনে এই বিষ ঢোকার পর ভেসিকলের সব ACh বের করে দেয়। ফলে ওই ACh দ্বারা পেশি কিছুক্ষণ সচল থাকতে পারে। এজন্য এই বিষের প্রতিক্রিয়া শুরু হয় একটু দেরীতে। তবে প্রতিক্রিয়া একবার শুরু হয়ে গেলে অবস্থা ভয়াবহ হয়ে যায়। দুঃখের ব্যাপার এই যে, ভেসিকল ধ্বংসের ক্ষতি শুধু অ্যাান্টিভেনমের মাধ্যমে রিভার্স করা যায় না। অর্থাৎ বিষকে নিষ্ক্রিয় করার পর শরীর নিজে থেকে এই ক্ষতি রিভার্স করে নিতে পারে না। তাই অ্যান্টিভেনম নেওয়ার পর শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলার জন্য ভিক্টিমকে অবশ্যই আরও কিছু সময় হাসপাতালে থাকতে হবে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ক্লিনিক্যাল সেবা নিতে হবে। বিটা নিউরোটক্সিনের কিছু প্রকারভেদ আছে যেগুলো আরও বেশি ক্ষতিকর। যেমন ইনল্যান্ড টাইপ্যানের বিটা নিউরোটক্সিনের প্যারাডক্সিন উপাদান পেশির মেমব্রেন নষ্ট করে দিতে পারে, ফসফোলিপিডকে ভেঙে অ্যারাকিডোনিক এসিড তৈরি করতে পারে যা পরবর্তিতে প্রি ও পোস্ট উভয় সিন্যাপ্টিক অঞ্চলেই রিভার্সের অযোগ্য ক্ষতি স্বাধন করতে পারে। আজকে আর অতদূর আলোচনায় যাব না। তবে এতটুকু যদি ফলো করে থাকেন তাহলেই মোটামুটি একটা ধারণা আসার কথা কেন গোখরার বিষের চাইতে কালাচের বিষ বেশি লিথাল। কিছু আরও ডিটেইলস এবং অন্যান্য সার্বিক কারণ থাকতে পারে, তবে এটা নিয়ে আজকে আর কথা বাড়াবো না। ফুটনোট : অস্ট্রেলিয়ান কিছু নিউরোটক্সিন বিষধারী ব্ল্যাক স্নেকের কামড়ে ভিক্টিমের লম্বা সময়ের জন্য গন্ধ ও স্বাদ বোঝার ক্ষমতা হারানোর উদাহরণ পাওয়া গেছে। এধরণের ঘটনা খুব রেয়ার এবং এ নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। তবে বাংলাদেশে কোনো নিউরোটক্সিন বিষধারী সাপের কারণে এরকম গন্ধ বা স্বাদ হারানোর উদাহরণ পাওয়া যায় নি, বা আছে কি না আমার জানা নেই। এ ধরনের অনুভুতির জন্য সরাসরি পেশির নড়াচড়া করতে হয় না জন্য এ ধরণের ঘটনা সাধারণত ঘটে না।
মো: নাফিউল ইসলাম
Facebook প্রোফাইল ↗Moderator, WSRTBD
এই নিবন্ধের সকল তথ্য জনসচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। সাপে কামড়ের ক্ষেত্রে অবিলম্বে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি জেলা সদর হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।