সচেতনতা ও গাইড ⏱️ 4 মিনিটের পাঠ 👁️ 180 বার পঠিত

কালাচ সাপ রাতে ঘুমন্ত মানুষকে কেন কামড়ায়?

এটা অনেকের ভুল ধারণা, উত্তরটা একটু বড় করেই দেই যাতে পুরো বিষয়টা খুব ভালোভাবে পরিষ্কার হয়। আমরা সবাই জানি সাপ একটা মাংসাশী প্রাণী। ইঁদুর, টিকটিকি, ব্য...

নাবিদ আল জুবায়ের
নাবিদ আল জুবায়ের
কালাচ সাপ রাতে ঘুমন্ত মানুষকে কেন কামড়ায়?

এটা অনেকের ভুল ধারণা, উত্তরটা একটু বড় করেই দেই যাতে পুরো বিষয়টা খুব ভালোভাবে পরিষ্কার হয়। আমরা সবাই জানি সাপ একটা মাংসাশী প্রাণী। ইঁদুর, টিকটিকি, ব্যাঙ আবার সাপও সাপেদের খাবার (কিং কোবরা, শঙ্খিনীদের প্রধান খাদ্য অন্য সাপ)। কিন্তু ঘাম তো জলীয় পদার্থ, ঘামে কি এমন কোনো উপাদান আছে যেটাতে কোনোভাবে সাপ আকর্ষিত হতে পারে বা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে? ঘাম মূলত পানি ছাড়া কিছুই নয়। এই পানির উৎস রক্তরস। মানে বুঝলেন তো? রক্তের যে পানি থাকে সেই পানির পরিবর্তিত রূপ হলো ঘাম। তবে এতে নগন্য মাত্রায় খাদ্য লবণ (NaCl) থাকে। এর পাশাপাশি পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক, কপার, আয়রন, নিকেল ও সীসা পাওয়া যায়। এই রাসায়নিক পদার্থ গুলো ঘামের সাথে লবন হিসেবে থাকে। এই জন্য ঘাম নোনতা স্বাদের হয়। এর মধ্যে এমন একটি উপাদানও নেই, যা সাপেরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করবে। তবে কালাচ সাপ কেনো রাতে ঘুমন্ত মনুষকে কামড়ায়? এর বেশ কিছু বিজ্ঞান সম্মত কারণ থাকতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর গ্রহণযোগ্য কারণ গুলো তুলে ধরছি- ১. কালাচ সাপ নকচার্নাল বা নিশাচর হওয়ায় রাতে শিকারে বের হয়। তখন খাদ্যের খোঁজে মানুষের ঘরেও প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা গরমের মৌসুমে মাটির মেঝেতে পাটি পেরে ঘুমায় বলে ঘরে ইঁদুরের খোঁজে সাপ আসলে ভুলবসত মানুষের গায়ে স্পর্শ লাগতেই পারে। তখন মানুষ নড়াচড়া করে। সাপ খুব সংবেদনশীল প্রাণী, তখন সাপ ভয় পেয়ে বা কোনোভাবে ব্যথা পেয়ে আত্মরক্ষার্থে ভেনোমাস বাইট করে দেয়। ২. শীতের রাত সাপেদের জন্য হুমকিস্বরূপ৷ সাপেরা পোইকিলোথার্মিক বা এক্টোথার্মিক প্রাণী, যাকে আমরা তথাকথিত শীতল রক্তের প্রাণী বলি। এরা নিজেদের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তবে মানুষ বা এজাতীয় হোমিওথার্মিক প্রাণী (তথাকথিত গরম রক্তের প্রাণী) নিজেদের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মানে বাইরের আবহাওয়া যাই হোক, মানুষের দেহের তাপমাত্রা সবসময় ৯৮.৪-৬ এর মধ্যে থাকে। একপ্রকার বিশেষ হোমিওস্টেসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গরম রক্তের প্রাণীরা দেহের তাপ স্থির রাখতে পারে। তবে সাপেরা এটা পারেনা। এদের দেহের তাপ সমান রাখতে বাইরের আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। অর্থাৎ কোনো সাপ যদি গরম পরিবেশ থেকে তার দেহ একবার গরম করে তাহলে শীতল পরিবেশে না যাওয়া পর্যন্ত নিজের দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক করতে পারবে না। আবার বিপরীতে শীতল পরিবেশ থেকে একবার দেহ শীতল হয়ে গেলে গরম পরিবেশে না যাওয়া পর্যন্ত দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হবে না। তাপমাত্রা অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত হলে আমাদের অনুভূতি কেমন হয়? জ্বর আসলে বা অসহ্য ঠান্ডায় আমাদের যেমন লাগে, ওদেরও তেমনই লাগে। বিপরীত পরিবেশে সময়মতো না পৌঁছাতে পারলে সাপেরা মারাও যেতে পারে। তাই শীতের রাতে সাপেদের গা ঠান্ডা হয়ে গেলে এরা গরম পরিবেশ খুঁজতে অস্থির হয়ে পরে। আর গরম পরিবেশ খুঁজতে খুঁজতেই মানুষের বাসস্থানে প্রবেশ করে। শীতের রাতে খুব সাধারণভাবেই মানুষজন লেপ-কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমায়। সাপেরা সেই উষ্ণতা নেয়ার জন্য কম্বল বা লেপের নিচে ঢুকলেই ঘটে বিপত্তি! আবার সেই একই ঘটনা... মানুষ ঘুমের মধ্যে হাত পা নড়ালে সাপ ভয় পেয়ে বা কোনোভাবে ব্যথা পেয়ে ভেনোমাস বাইট করে দেয়।

৩. শুরুতেই বলেছি কালাচ সাপ নকচার্নাল বা নিশাচর। তাই এরা আলো সহ্য করতে পারে না। জোৎস্নার রাতে চাঁদের আলোও এদের জন্য বিরক্তিকর। অন্ধকার পরিবেশের খোঁজেও এরা মানুষের ঘরে ঢুকে। পরবর্তী বিষয়গুলো সেইম। উঞ্চতা বা খাবারের খেঁজে ঘুমন্ত মানুষের আশেপাশে আসলে ঘুমন্ত মানুষের অনিয়ন্ত্রিত গতিবিধির কারণে সাপ ভয়ে বা আঘাত পেয়ে কামড়ে দেয়। আর পয়েন্ট বাড়াবো না, আশাকরি মূল বিষয়টা বুঝেছেন। বিভিন্ন কারণে সাপ মানুষের ঘরে ঢুকে, তারপর ভূলবসত দূর্ঘটনা টা ঘটে। ঘাম খেতে সাপ আসেনা এটা একদমই স্পষ্ট। এখন একটা ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট শেয়ার করি... রাতে ঘড়ে কালাচ আসা ঠেকাতে ঘরের আশপাশে পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি ঘড়ের চার পাশে একটু বেশি পাওয়ারের লাইট লাগান! কালাচ আলো সহ্য করতে পারে না, বিশেষ করে রাতে আরো না। সাপের কামড় এড়াতে সচেতনতার বিকল্প নেই। অন্তত সাপ মেরে কখনোই কামড় থেকে বাঁচা সম্ভব না। সাপ কি আমাদের মতো সমাজবদ্ধ প্রাণী? ওদেরকে মানব সমাজে টেনে এনেছি আমরাই। ওদের বাসস্থান হলো বন জঙ্গল। আমরা বনজঙ্গল ধ্বংস করে বসতি, কলকারখানা স্থাপন করেছি। ওরা যাবে কই? সাপ পৃথিবীতে টিকে আছে ১৫ কোটি বছর ধরে (মেসোজোয়িক যুগ থেকে)। মাঝে উল্কাপিণ্ডের আঘাত, বরফযুগ পর্যন্ত পার করেছে, তবুও বিলুপ্ত হয়নি। আর আজ সাপ বিলুপ্তির পথে! বিষধর সাপ তার ফুড চেইন এবং নির্ধারিত পরিবেশে থাকলে কখনোই ভয়ঙ্কর নয়। সাপের বিষের অ্যান্টিভেনোমের প্রয়োজনীয়তা গবেষকেরা লক্ষ করেছেন ১৮৭৫-৮০ সালের পর থেকে। তার মানে বুঝছেন এর আগে সাপের কামড়ে মৃত্যু কতোটা রেয়ার ছিলো! যত পেছনে যাবেন সাপের কামড়ের ঘটনা ততই কম লক্ষনীয় হবে। কারণ একটাই, তখন তারা তাদের পরিবেশে ছিলো আর মানুষ মানুষের পরিবেশে। তাই সচেতন হোন, গাছ লাগান, প্রাণীকে হত্যা না করে তাকে তার পরিবেশে স্বাধীন ভাবে বাঁচতে দেয়ার মূল্যবোধ গড়েতুলুন আমাদের সাথে। কোনো সাপকে গভীর বনে ছেড়ে দিলে এবং তার ফুডসার্কেল নিশ্চিত করলে সেটা কখনো পুনরায় মানবসমাজে ফিরে আসবে না। সবাই নিরাপদে পৃথিবীকে উপভোগ করবে, তারা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করবে আর আমরা সেই সুযোগ টা করে দিবো।

নাবিদ আল জুবায়ের

নাবিদ আল জুবায়ের

Facebook প্রোফাইল ↗

Organizing secretary, WSRTBD.

সাপ ও বন্যপ্রাণী - রেসকিউ বিডি
Google Play Google Play থেকে ফ্রি নামান ★ ৪.৯ রেটিং • সম্পূর্ণ বিনামূল্যে
⚕️ জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা

এই নিবন্ধের সকল তথ্য জনসচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। সাপে কামড়ের ক্ষেত্রে অবিলম্বে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি জেলা সদর হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।

সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় নিবন্ধ

সবগুলো দেখুন →